চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাতে আসন্ন পরিবর্তনের এক...

সম্প্রতি ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাতে আসন্ন পরিবর্তনের এক বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যা দেশের শ্রমবাজারের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাতে প্রায় ৩০-৪০% নতুন দক্ষতার প্রয়োজন হবে, যেখানে প্রচলিত অনেক পদ স্বয়ংক্রিয়করণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু উৎপাদন খাতকেই নয়, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষি খাতকেও প্রভাবিত করবে, যা আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দ্রুত রূপান্তরকে অপরিহার্য করে তুলেছে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো এই পরিবর্তনের ঢেউ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে এখন চলছে গভীর পর্যালোচনা।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), রোবোটিক্স, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবনী ধারণার সমন্বয়ে গঠিত, বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের প্রকৃতিকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপাপটে, এই বিপ্লবের প্রাথমিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প খাতে স্বয়ংক্রিয়তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। উদাহরণস্বরূপ, পোশাক শিল্পে রোবোটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় সেলাই মেশিনের ব্যবহার একদিকে উৎপাদন দক্ষতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ম্যানুয়াল শ্রমনির্ভর হাজার হাজার কর্মীর চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। একইভাবে, ব্যাংকিং এবং আর্থিক সেবায় AI-চালিত চ্যাটবট ও স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যবস্থা প্রচলিত গ্রাহক সেবা এবং ডেটা এন্ট্রি পদের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিচ্ছে। এসব প্রযুক্তি কেবল পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোকেই প্রতিস্থাপন করছে না, বরং ডেটা বিশ্লেষণ, জটিল সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীলতার মতো উচ্চ-স্তরের দক্ষতার জন্য নতুন চাহিদা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করতে হলে তাদের কেবল একাডেমিক জ্ঞান নয়, বরং প্রায়োগিক ও অভিযোজনযোগ্য দক্ষতা অর্জনে সক্ষম করে তুলতে হবে, যা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে কর্মসংস্থান খাতে যে পরিবর্তন আসছে, তার ফলাফল বহুমুখী। একদিকে, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিক্স প্রকৌশল এবং এআই ডেভেলপমেন্টের মতো নতুন খাতে প্রচুর চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের আওতায় এসব খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ, উৎপাদন এবং সেবা খাতের অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য চাকরি হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ হতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো কর্মসংস্থান বৈষম্যকেও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যেখানে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ কর্মীরা উচ্চ বেতন ও সুযোগ সুবিধা পাবে, আর অদক্ষ বা স্বল্প-দক্ষ কর্মীরা পিছিয়ে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের সিলেবাস ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকীকরণ করতে হচ্ছে, যাতে স্নাতকরা কেবল ডিগ্রিধারী না হয়ে, বাস্তব বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, কারিগরি শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় ও যুগোপযোগী করে তোলার মাধ্যমে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব।

এই পরিবর্তনের ঢেউ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও চ্যালেঞ্জগুলো এখনও বিশাল। স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো দেশের বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য কাজ করছে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটাতে আংশিকভাবে সহায়ক হচ্ছে। তবে, এই প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে কতটা সক্ষম, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, কিন্তু গুণগত মান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রশিক্ষণের অভাব এখনও রয়ে গেছে। NSDA জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা মান নির্ধারণ এবং সমন্বয়ের কাজ করছে, যা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির গুণগত মান নিশ্চিত করতে সহায়ক। তবে, এসব উদ্যোগের গতি এবং পরিধি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ব্যাপকতা বিবেচনায় পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, আধুনিক ল্যাবরেটরির অপ্রতুলতা এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা এই অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারলে, দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল থেকে দেশ বঞ্চিত হবে।

সূচক ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর পরিবর্তনের হার (%)
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) মোট শিক্ষার্থীর অনুপাত (BANBEIS)* ১৪.২% ২২.৫% +৮.৩%
SEIP প্রকল্পের আওতায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সংশ্লিষ্ট দক্ষতায় প্রশিক্ষিত জনবল (সংখ্যা) ৫০,০০০ ১,৩০,০০০ +১৬০%
UGC অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪আইআর সংশ্লিষ্ট নতুন কোর্স/প্রোগ্রাম প্রবর্তন (সংখ্যা) ১২ ৪৫ +২৭৫%
NSDA কর্তৃক প্রণীত নতুন জাতীয় পেশাগত দক্ষতা মান (NOSS) সংখ্যা (৪আইআর সংশ্লিষ্ট) ৮ ৩৫ +৩৩৭.৫%
শ্রমবাজারে ৪আইআর প্রযুক্তির কারণে পরিবর্তিত দক্ষতা চাহিদা (আনুমানিক শতাংশ বৃদ্ধি) ২৫% ৫৫% +৩০%

উৎস: NSDA, BANBEIS, UGC এবং SEIP-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের প্রাথমিক তথ্য। *২০৩০ সালের মধ্যে TVET-এ শিক্ষার্থীর অনুপাত ৩০% এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়, UGC এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে একটি 'জাতীয় চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পাঠ্যক্রম সংস্কার টাস্কফোর্স' গঠন করতে হবে, যা আগামী ১৮ মাসের মধ্যে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।
  • ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA)-কে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সংশ্লিষ্ট নতুন জাতীয় পেশাগত দক্ষতা মান (NOSS) দ্রুততার সাথে প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP)-কে এসব NOSS-এর ভিত্তিতে শিল্প-শিক্ষায়তনিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিশেষায়িত রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় ৪আইআর শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প' হাতে নিতে হবে, যার আওতায় আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করা হবে এবং অত্যাধুনিক ল্যাব ও অবকাঠামো নির্মাণে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator