ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
মাত্র তিন বছর আগেও দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতকে ঘিরে ছিল অপার সম্ভাবনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার হাতছানি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে...

মাত্র তিন বছর আগেও দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতকে ঘিরে ছিল অপার সম্ভাবনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার হাতছানি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে সংঘটিত প্রতারণা, সময়মতো পণ্য ডেলিভারি না দেওয়া, অগ্রিম অর্থ পরিশোধের পরও রিফান্ড না পাওয়ার মতো ঘটনাগুলো এই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গঠিত ডিজিটাল কমার্স সেলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে অর্ধেকেরও কম। এই পরিসংখ্যান কেবল ভোক্তাদের আস্থাহীনতার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা, এই বিতর্ককেও নতুন করে উসকে দিচ্ছে।

ডিজিটাল বাণিজ্যের দ্রুত প্রসারের প্রাথমিক ধাপে একটি সুসংহত ও দূরদর্শী নীতিমালার অভাব ছিল প্রকট। যখন হাজার হাজার নতুন উদ্যোক্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এফ-কমার্স এবং প্রচলিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছিলেন, তখন তাদের জন্য কোনো স্পষ্ট আইনি কাঠামো বা তদারকি প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের কর ও ভ্যাট আদায় নিয়ে দ্বিধায় ছিল, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করেছে, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে একটি অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সহজ হলেও, তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো সুস্পষ্ট বিধিবিধান না থাকায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগের অপব্যবহার করেছে। এমনকি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও ডিজিটাল ব্যবসাগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন সক্রিয় ছিল না, যা বড় আকারের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং এই খাতের টেকসই বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করেছে।

এই খাতের সমস্যা কেবল নীতি প্রণয়নে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিদ্যমান নীতিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নেও ছিল বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা। উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’ অনেক ইতিবাচক দিক নিয়ে এলেও, এর প্রয়োগে দেখা গেছে নানা চ্যালেঞ্জ। নির্দেশিকা অনুযায়ী, পেমেন্ট গেটওয়েগুলো গ্রাহকের টাকা সরাসরি মার্চেন্টকে না দিয়ে একটি এসক্রো সেবায় (Escrow Service) রাখার কথা ছিল, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি মানা হয়নি বা তদারকির অভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) ডিজিটাল কমার্সের মাধ্যমে দেশের পণ্য বিদেশে রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, অভ্যন্তরীণ বাজারের বিশৃঙ্খলা এবং আস্থার সংকটের কারণে এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, ডিজিটাল অর্থনীতিতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জরুরি, যেখানে NBR, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে এমন সমন্বিত উদ্যোগের অভাব এই খাতের সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছে।

ডিজিটাল রিটেইলের প্রসার বৈশ্বিকভাবে একটি অনিবার্য বাস্তবতা হলেও, বাংলাদেশে এর সিস্টেমেটিক দুর্বলতাগুলো সমাধান করা জরুরি। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এই দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে রাখে, তখন দ্রুত বিচার ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না থাকায় গ্রাহকরা হতাশ হন। এর পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় তাদের উপর নজরদারি করা NBR এর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে, কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও তা করের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অনানুষ্ঠানিকতা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথেও বড় বাধা। এই সম্মিলিত প্রেক্ষাপটই প্রশ্ন তৈরি করে যে, এটি কি কেবল নীতি প্রণেতাদের দূরদর্শিতার অভাব, নাকি সামগ্রিক সিস্টেমের কাঠামোগত দুর্বলতা যা এই খাতকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে?

খাত ২০১৮ (আনুমানিক বাজার মূল্য) ২০২১ (আনুমানিক বাজার মূল্য) ২০২৩ (আনুমানিক বাজার মূল্য) বার্ষিক বৃদ্ধির হার (CAGR, ২০১৮-২০২৩)
ই-কমার্স (বিলিয়ন টাকা) ৮০ ২০০ ৪০০ ৩৮%
এফ-কমার্স (বিলিয়ন টাকা) ১০ ৭০ ১৫০ ৭২%
ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারকারী (মিলিয়ন) ২০ ৪০ ৬০ ২৪.৫%
অনলাইন বিক্রেতার সংখ্যা (লক্ষ) ১.৫ ৪.০ ৭.০ ৩৫%

উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ই-ক্যাব (বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত)।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র 'ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা 'ডিজিটাল কমার্স আইন, ২০২৪' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে কাজ করবে। এই অথরিটির প্রধান কাজ হবে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর লাইসেন্সিং, তদারকি, ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সরলীকৃত ও স্বয়ংক্রিয় অনলাইন নিবন্ধন এবং কর পরিশোধ পদ্ধতি চালু করতে হবে, যা 'আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪' এবং 'মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২' এর আওতায় কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এনে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি 'ডিজিটাল বিজনেস কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করতে হবে, যা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। এর ফলে, ভবিষ্যতে এই খাত থেকে বড় কোম্পানিগুলো পুঁজি বাজারে প্রবেশ করলে তাদের জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator