ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট-এর অজানা দিক: কাঁচামাল স্বনির্ভরতার ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট-এর অজানা দিক: কাঁচামাল স্বনির্ভরতার ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ফারহান তানভীর  avatar   
ফারহান তানভীর
ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট-এর অজানা দিক: কাঁচামাল স্বনির্ভরতার ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট-এর অজানা দিক: কাঁচামাল স্বনির্ভরতার ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের (Active Pharmaceutical I...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের (Active Pharmaceutical Ingredients - API) প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ এখনও আমদানি নির্ভর। দেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের একটি সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করলেও, এই কাঁচামাল নির্ভরতা এক অদৃশ্য ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির জন্ম দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সামান্যতম অস্থিরতায় আমাদের পুরো খাতকে সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক অনুমোদিত নতুন ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রেও অনেক সময় কাঁচামালের সহজলভ্যতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে, কেবল রপ্তানিমুখী ফিনিশড প্রোডাক্টের দিকে নজর না দিয়ে, কাঁচামাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন এখন আর কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিগত কয়েক দশকে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বর্তমানে এটি ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল কাঁচামাল আমদানির বোঝা। চীন ও ভারতের মতো হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বৈশ্বিক API উৎপাদনের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী (যেমন কোভিড-১৯), বা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে এই দেশগুলো থেকে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হয়, তখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো তীব্র সংকটে পড়ে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা, এমনকি জরুরি ওষুধের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর মতে, বিশেষ করে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কাঁচামালের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা একটি বড় অগ্রাধিকার। এই নির্ভরতা কেবল অর্থনৈতিক চাপই সৃষ্টি করে না, বরং দেশের ঔষধ উৎপাদন ক্ষমতাকে এক সুতার ওপর ঝুলিয়ে রাখে, যা জাতীয় সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এই কাঁচামাল নির্ভরতার ভূ-রাজনৈতিক দিকটি অত্যন্ত জটিল। বিশ্বের বৃহৎ API উৎপাদক দেশগুলো, বিশেষ করে চীন, তাদের উৎপাদন ক্ষমতাকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বাণিজ্য বিরোধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন অথবা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তারা কাঁচামাল সরবরাহ সীমিত করতে পারে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর সরাসরি আঘাত হানতে পারে। আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেটে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে কেবল ফিনিশড প্রোডাক্টের উৎপাদনই যথেষ্ট নয়, বরং সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে, কারণ এই ওষুধগুলোর বৈশ্বিক সরবরাহ প্রায়শই সীমিত থাকে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে কাঁচামালের উৎস বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দিতে হবে এবং স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য একটি সুসংহত প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়। এতে কেবল আমদানি খরচই কমবে না, বরং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশের ওষুধ শিল্প সুরক্ষিত থাকবে।

বছর মোট API আমদানি (USD বিলিয়নে) স্থানীয় চাহিদা পূরণে আমদানিকৃত API-এর শতাংশ স্থানীয় API উৎপাদন (USD বিলিয়নে)
২০১৯ ১.২০ ৮৮% ০.১৫
২০২০ ১.৩৫ ৯২% ০.১৬
২০২১ ১.৫৫ ৯১% ০.১৮
২০২২ ১.৭৫ ৯০% ০.২১
২০২৩ ১.৯০ ৮৯% ০.২৫

উৎস: MOHFW ও DGDA-এর সম্মিলিত প্রতিবেদন (আনুমানিক সংখ্যা)

সুপারিশ

  • একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী 'API শিল্প পার্ক' প্রতিষ্ঠা করা: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ API শিল্প পার্ক (যেমন, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া API শিল্প পার্ক) দ্রুত বাস্তবায়ন করা। এই পার্কে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৫ বছরের ট্যাক্স হলিডে, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণ, ভর্তুকি মূল্যে জমি ও ইউটিলিটি সংযোগ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রক্রিয়া দ্রুততর করার জন্য 'ওষুধ শিল্প নীতি ২০০৫' (সংশোধিত) এর আওতায় বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।
  • গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) জাতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা: জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে একটি 'জাতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা, যা প্রতি বছর জিডিপি'র ০.৫% অর্থায়ন পাবে। এই তহবিল ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে এপিআই সংশ্লেষণ, বায়োটেকনোলজি এবং জেনেরিক ওষুধ গবেষণায় সহযোগিতা জোরদার করবে। 'জাতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন নীতি ২০১৭' এর আলোকে নির্দিষ্ট গবেষণা ক্ষেত্র চিহ্নিত করে অর্থায়ন করা উচিত।
  • নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও সরবরাহ চেইন বৈচিত্র্যকরণ: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর সক্ষমতা বাড়াতে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা, যাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত API-এর মান আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয় এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। একই সাথে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কে বৈশ্বিক উৎস থেকে API আমদানির ক্ষেত্রে একক দেশ নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে সরবরাহ চেইন বৈচিত্র্যকরণ নীতি (যেমন, 'ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২' এর অধীনে বিশেষ বিধিমালা) গ্রহণ করতে হবে এবং একটি 'কৌশলগত API রিজার্ভ' গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান তানভীর

ফারহান তানভীর 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator