বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫২ মিলিয়ন টন কৃষিজ বর্জ্য (যেমন - ধানের খড়, গমে...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫২ মিলিয়ন টন কৃষিজ বর্জ্য (যেমন - ধানের খড়, গমের ভুসি, ভুট্টার ডাঁটা, আঁশের উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ, ফলের খোসা ও সবজির উচ্ছিষ্ট) উৎপাদিত হয়। এর একটি বিশাল অংশ অব্যবহৃত থেকে যায় অথবা অপরিকল্পিতভাবে পোড়ানো হয়, যা একদিকে পরিবেশ দূষণ ঘটায় এবং অন্যদিকে মূল্যবান সম্পদের অপচয় করে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের প্রচলিত রৈখিক মডেল, যা 'গ্রহণ করো, উৎপাদন করো, ফেলে দাও' নীতির উপর নির্ভরশীল, তা যে ব্যর্থ হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ব্যর্থতা শুধু পরিবেশগত সমস্যাই তৈরি করছে না, বরং একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতের বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে, যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করে একটি টেকসই 'সার্কুলার ইকোনমি' বা বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) যখন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে, তখন কৃষিজ উপজাত ও খাদ্য বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। দেশের মোট বর্জ্যের প্রায় ৭০-৮০% জৈব বর্জ্য, যার মধ্যে কৃষিজ ও খাদ্য বর্জ্যের পরিমাণ সিংহভাগ। অপরিকল্পিতভাবে এসব বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলা বা পোড়ানোর ফলে মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও, এসব বর্জ্য মাটির উর্বরতা হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, ধানের খড় পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ শীতকালে ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে প্রকট আকার ধারণ করে, যা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একইসাথে, এই বর্জ্যগুলিকে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার, পশুখাদ্য, বায়োগ্যাস, বায়োচার বা অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা আমরা অনেকাংশেই কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছি।

বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত নীতিমালার অভাব, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অনুপস্থিতি এবং গবেষণা ও উন্নয়নে সীমিত বিনিয়োগ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) কৃষিজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গবেষণা পরিচালনা করলেও, সেগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ বা বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনো অনেক দুর্বলতা বিদ্যমান। কৃষকদের মধ্যে বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তার অপ্রাপ্যতাও এই সমস্যার একটি বড় কারণ। আমাদের বর্তমান আইনি কাঠামো মূলত বর্জ্য অপসারণের উপর জোর দেয়, কিন্তু বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার এবং পুনর্চক্রায়নের মতো বৃত্তাকার অর্থনীতির মূল নীতিগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও প্রণোদনার অভাব রয়েছে। ফলে, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা এই সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় সমর্থন ও কাঠামোগত সহায়তার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদিও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ এর মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু দিক নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ 'সার্কুলার ইকোনমি' বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের এখনো অভাব রয়েছে।

বর্জ্যের ধরন পরিমাণ (আনুমানিক, মিলিয়ন টন/বছর) বর্তমান ব্যবহার/পুনর্ব্যবহার হার (আনুমানিক %) সম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনা (মিঃ টন/বছর)
কৃষিজ বর্জ্য (ধানের খড়, ভুট্টার ডাঁটা, আঁশ ইত্যাদি) ৫২ - ৫৪ ১৫-২০% (প্রধানত জ্বালানি/পশুখাদ্য) ৩০-৩৫ (জৈব সার, বায়োগ্যাস, বায়োচার, পশুখাদ্য)
খাদ্য বর্জ্য (উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত) ১০ - ১৫ <৫% (কম্পোস্ট/পশুখাদ্য) ৭-১০ (কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস)
শহর ও গ্রামীণ এলাকার জৈব বর্জ্য ১৫ - ২০ <১০% (কম্পোস্ট/বায়োগ্যাস) ১০-১২ (কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস)
উৎস: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণাপত্রের সমন্বিত উপাত্ত।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়-কে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় বৃত্তাকার অর্থনীতি কৌশলপত্র' প্রণয়ন করতে হবে, যা বর্জ্য হ্রাস, পুনঃব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করবে। এই কৌশলপত্রের আওতায়, কৃষিজ ও খাদ্য বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং শিল্প-কারখানা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বর্জ্য পৃথকীকরণ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সংশোধন করতে হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-কে কৃষিজ বর্জ্য থেকে উচ্চমূল্যের জৈব সার, বায়োচার, পশুখাদ্য এবং বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও মানোন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই প্রযুক্তিগুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কাছে হস্তান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-কে কৃষিজ ও খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতে হবে। এর পাশাপাশি, বর্জ্য-থেকে-সম্পদ রূপান্তরের প্রকল্পগুলোতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক প্রণোদনা, কর রেয়াত এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) এই খাতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator