জেলা স্টেডিয়াম ও একাডেমি: তালাবদ্ধ স্বপ্ন, অব্যবহৃত সম্ভাবনা
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে যে, দেশের ৭৯টি জেলা স্টেডিয়ামের মধ্যে অন্তত ৬৫টিরও বেশি হয় নিয়মিত ব্যবহার বা পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ দশায় রয়েছে, অথবা সেগুলোর সংলগ্ন একাডেমিগুলো নিষ্ক্রিয়। উদাহরণস্বরূপ, বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের মতো কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়মিত বড় ইভেন্ট আয়োজন করলেও, পিরোজপুর বা কুড়িগ্রামের মতো জেলার স্টেডিয়ামগুলো বছরের পর বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, যা স্থানীয় ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের পথে এক বিশাল অন্তরায়। এই অব্যবহৃত অবকাঠামো এবং তালাবদ্ধ একাডেমিগুলো কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, বরং হাজার হাজার তরুণ ক্রীড়াবিদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে অকালে বিনষ্ট করছে, যা জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এই সংকট কেবল অবকাঠামোগত জরাজীর্ণতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর মূলে রয়েছে সুদূরপ্রসারী নীতিগত ত্রুটি এবং সমন্বয়হীনতা। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ করলেও, সেই অর্থের সদ্ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থ রক্ষণাবেক্ষণের পরিবর্তে নতুন, অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় করা হয়, অথবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা অব্যবহৃত থেকে যায়। জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৮-এর অধীনে প্রতিটি জেলা স্টেডিয়ামের সাথে একটি করে আবাসিক বা অনাবাসিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। প্রশিক্ষিত কোচের অভাব, আধুনিক সরঞ্জামাদির অপ্রতুলতা, এবং স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব একাডেমি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসার প্রক্রিয়াটি থমকে গেছে, এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গন এখনো ঢাকা-কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি পায়নি, যা গ্রামীণ যুবকদের ক্রীড়াঙ্গনে অংশগ্রহণের আগ্রহকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
এই অব্যবহৃত সম্ভাবনা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ক্রীড়া অবকাঠামো কেবল খেলাধুলার জন্য নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে। একটি সচল স্টেডিয়াম ও একাডেমি স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং অন্যান্য পরিষেবা খাতের জন্য আয়ের উৎস তৈরি করে। কিন্তু যখন এই অবকাঠামো নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন এই ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এডিবি (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেকসই ক্রীড়া অবকাঠামো এবং যুব উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করে থাকে, যা কেবল ক্রীড়া প্রতিভা তৈরি নয়, বরং যুবকদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এডিবি'র অর্থায়নে পরিচালিত যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যদি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা এডিবি-এর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত জেলা ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও একাডেমি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারত, তবে এর সুফল বহু বিস্তৃত হতে পারত। এই অবহেলা কেবল বর্তমান প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের সুযোগ বঞ্চিত করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, যা একটি সুস্থ ও কর্মঠ জাতি গঠনে বড় বাধা।
| বিষয় | সংখ্যা/শতাংশ (আনুমানিক) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| মোট জেলা স্টেডিয়াম | ৭৯টি | দেশের সব জেলায় একটি করে স্টেডিয়াম রয়েছে। |
| নিয়মিত ব্যবহৃত স্টেডিয়াম | ১৫-২০টি (প্রায় ১৯-২৫%) | মূলত বিভাগীয় শহর বা গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে ব্যবহার বেশি। |
| অকার্যকর/অব্যবহৃত স্টেডিয়াম | ৬৫+টি (প্রায় ৭৫% এর বেশি) | রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, স্থানীয় খেলাধুলার অনুপস্থিতি বা অব্যবস্থাপনার কারণে। |
| স্টেডিয়াম-সংলগ্ন সক্রিয় একাডেমি | ১০-১২টি (প্রায় ১৩-১৫%) | অধিকাংশ একাডেমি হয় নিষ্ক্রিয় অথবা অনিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে। |
| যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট (২০২৩-২৪, ক্রীড়া খাত) | প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা | অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দের একটি অংশ। |
| জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট (২০২২-২৩) | মোট বরাদ্দের <১০% | অধিকাংশ অর্থ নতুন প্রকল্প বা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। |
উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২২-২৩)
সুপারিশ
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'জাতীয় স্টেডিয়াম ও একাডেমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা' (National Stadium & Academy Management Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় প্রতিটি জেলা স্টেডিয়ামের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহার ও কার্যক্রম পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে, এবং স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এছাড়া, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয় কমিটির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য নিয়মিত ত্রৈমাসিক নিরীক্ষা ও জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকার, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এডিবি (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে নিবিড় আলোচনা করে একটি 'ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রতিভা অন্বেষণ তহবিল' (Sports Infrastructure Development & Talent Discovery Fund) গঠন করতে পারে। এই তহবিল থেকে জেলা পর্যায়ের স্টেডিয়াম আধুনিকীকরণ, একাডেমি স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অর্থায়ন করা হবে, যা স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করবে। এক্ষেত্রে, তহবিল ব্যবহারের জন্য একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসন, ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ এবং মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
- জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৮' এর আলোকে প্রতিটি জেলা স্টেডিয়াম-সংলগ্ন একাডেমির জন্য একটি মানসম্মত পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করতে হবে। 'ক্রীড়া প্রশিক্ষণ অধিদপ্তর' এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে যোগ্য প্রশিক্ষক নিয়োগ, তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও, স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যা একটি টেকসই প্রতিভা পাইপলাইন তৈরি করবে।