ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা, ২০২১' এবং এর পরবর্তী সংশোধনীগুলো ডিজিটাল রিটেইল খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে যথেষ্ট সার্থক হয়নি, বরং বহুলাংশে খাতটিকে আরও জটিলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ বেশ কয়েকটি বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংঘটিত হাজার হাজার কোটি টাকার গ্রাহক প্রতারণার ঘটনাগুলো কেবল একক প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনেও এই খাতের দুর্বল নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং সুশাসনের অভাবকে বারবার চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতিকে এক অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এটি কি কেবল নীতি প্রণেতাদের দূরদর্শিতার অভাব, নাকি সামগ্রিক সিস্টেমের গভীর দুর্বলতা – তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বাংলাদেশের ডিজিটাল রিটেইল খাত, বিশেষত ই-কমার্স এবং এফ-কমার্স, গত এক দশকে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই কাঠামো এবং পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার অভাবে শুরু থেকেই হোঁচট খাচ্ছিল। ২০১২ সালে যখন ই-কমার্স তার প্রাথমিক পর্যায় পার করছিল, তখন থেকেই একটি সুসংগঠিত আইনি কাঠামো তৈরির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলো বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে দীর্ঘ সময় নেয়। ফলস্বরূপ, কোনো কঠোর নজরদারি বা জবাবদিহিতা ছাড়াই অসংখ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গজিয়ে ওঠে, যার মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কেবল একটি নির্দেশিকা বা নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান অত্যাবশ্যক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শুরু থেকে ডিজিটাল লেনদেনের উপর একটি সুসংহত কর কাঠামো ও ট্র্যাকিং সিস্টেম তৈরিতে ব্যর্থতা প্রদর্শন করেছে, যা অসংখ্য অনলাইন বিক্রেতাকে কর জালের বাইরে থাকতে সাহায্য করেছে এবং সরকারের রাজস্ব আয়কেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ই-কমার্স খাতের পাশাপাশি, ফেসবুক ভিত্তিক বাণিজ্য বা এফ-কমার্স এর বিস্তার একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিক্রেতারা সাধারণত ব্যক্তিগত প্রোফাইল বা পেজের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে, যা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার বাইরে রাখে। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME) এই মাধ্যমে ব্যবসা করলেও, তাদের অধিকাংশই কোনো আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত নয়। এর ফলে একদিকে যেমন NBR তাদের থেকে রাজস্ব আদায় করতে পারছে না, তেমনি অন্যদিকে গ্রাহক প্রতারণার ঘটনা ঘটলে অভিযোগ জানানোর বা প্রতিকার পাওয়ার পথ প্রায় থাকে না বললেই চলে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ডিজিটাল মাধ্যমে দেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার যে সম্ভাবনা দেখছে, তা এই অনিয়ন্ত্রিত ও আস্থাহীনতার পরিবেশে মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি সুসংহত ডিজিটাল ট্রেড পলিসি এবং ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স প্রমোশন ফ্রেমওয়ার্কের অনুপস্থিতি দেশের ডিজিটাল পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মতো আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও ডিজিটাল স্টার্টআপগুলির জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল, যা অনেক সময় দেখা যায়নি।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি কেবল নীতি প্রণেতাদের দূরদর্শিতার অভাব নয়, বরং সামগ্রিক সিস্টেমের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে যেখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। গ্রাহক সুরক্ষা, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা, কর আদায় এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ—এই প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল রিটেইল খাত একটি সুসংহত ও আধুনিক কাঠামো থেকে বঞ্চিত। এই দুর্বলতা বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে দিচ্ছে না এবং অসংখ্য উদ্যোক্তা ও গ্রাহককে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ই-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল খাতের কিছু বাস্তব তথ্য
সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (আনুমানিক)
ই-কমার্স বাজারের আকার (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ১.৬ ২.০ ২.৫ ৩.১ ৪.৫
বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (%) ২৫ ২৫ ২৫ ২৪ ৪৫
মোট অনলাইন বিক্রেতার সংখ্যা (আনুমানিক) ৫০,০০০ ৭৫,০০০ ১,০০,০০০ ১,৫০,০০০ ২,০০,০০০+
এফ-কমার্স বিক্রেতার সংখ্যা (আনুমানিক) ১,০০,০০০ ২,০০,০০০ ৩,০০,০০০ ৫,০০,০০০ ৭,০০,০০০+
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা ৩,৫০০ ৪,২০০ ৪৫,০০০+ ৩০,০০০+ ২০,০০০+
ই-কমার্স থেকে NBR এর রাজস্ব আয় (বিলিয়ন টাকা) ০.৮ ১.২ ১.৮ ২.৫ ৩.৫

উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), বাংলাদেশ ব্যাংক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র 'ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্স উভয় খাতের জন্য একটি সমন্বিত নিবন্ধন প্রক্রিয়া, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং লাইসেন্সিং ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এই অথরিটির মাধ্যমে 'ডিজিটাল কমার্স আইন, ২০২৪' (প্রস্তাবিত) কার্যকর করা হবে, যেখানে গ্রাহক সুরক্ষা, ডেটা প্রাইভেসি এবং বিক্রেতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান থাকবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল লেনদেন পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে সকল অনলাইন বিক্রেতার (ই-কমার্স ও এফ-কমার্স সহ) লেনদেন ট্র্যাক করা সহজ হবে এবং তাদের জন্য একটি সরলীকৃত ও ডিজিটাল ট্যাক্স রেজিস্ট্রেশন এবং রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর জালের আওতায় আনতে উৎসাহিত করবে।
  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) কে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডিজিটাল বিক্রেতাদের জন্য আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে (যেমন অ্যামাজন, ইবে) পণ্য রপ্তানির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা এবং সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর সাথে যৌথ উদ্যোগে ডিজিটাল স্টার্টআপগুলির জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট আকৃষ্ট করতে একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator