এগ্রি-টেক: কীটনাশক ছিটানোয় ড্রোন প্রযুক্তি – সাশ্রয়ী সমাধান নাকি ব্যয়বহুল বিলাসিতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক: কীটনাশক ছিটানোয় ড্রোন প্রযুক্তি – সাশ্রয়ী সমাধান নাকি ব্যয়বহুল বিলাসিতা?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক: কীটনাশক ছিটানোয় ড্রোন প্রযুক্তি – সাশ্রয়ী সমাধান নাকি ব্যয়বহুল বিলাসিতা?
এগ্রি-টেক: কীটনাশক ছিটানোয় ড্রোন প্রযুক্তি – সাশ্রয়ী সমাধান নাকি ব্যয়বহুল বিলাসিতা?
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ধলেশ্বরী চরে ড্রোন ব্যবহার করে ধানক্ষেতে কীটনাশক ছিটানোর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ দেশ...

সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ধলেশ্বরী চরে ড্রোন ব্যবহার করে ধানক্ষেতে কীটনাশক ছিটানোর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ দেশের কৃষিখাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই পাইলট প্রকল্পটি, যা গত বোরো মৌসুমে পরিচালিত হয়েছিল, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি কীটনাশকের অপচয় কমানোর এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখিয়েছে। DAE-এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্প্রে করার কার্যকারিতা প্রায় ৯০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য। কৃষিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই সংযুক্তি, বিশেষত ক্রমবর্ধমান শ্রমিকের অভাব এবং রাসায়নিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি যখন প্রকট, তখন 'এগ্রি-টেক: কীটনাশক ছিটানোয় ড্রোন প্রযুক্তি – সাশ্রয়ী সমাধান নাকি ব্যয়বহুল বিলাসিতা?' এই প্রশ্নটি গভীরভাবে আলোচনার দাবি রাখে। এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ, যেমন ভারত ও ভিয়েতনামে, যেখানে কৃষি ড্রোন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে কীটনাশক ছিটানোর সময় কৃষকদের নানাবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। উচ্চমূল্যের ও অদক্ষ শ্রমিকের অপ্রাপ্যতা, সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং সরাসরি রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে, বড় আকারের জমিতে বা যেখানে ফসলের ঘনত্ব বেশি, সেখানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে স্প্রে করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়। এক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। একটি কৃষি ড্রোন, তার উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি এবং নির্ভুল নেভিগেশন সিস্টেমের সাহায্যে, এক ঘণ্টায় প্রায় ১০-১৫ একর জমিতে কীটনাশক ছিটাতে সক্ষম, যা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ১০-১৫ জন শ্রমিকের সারাদিনের কাজের সমান। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিকের ব্যবহার প্রায় ২০-৩০% কমানো সম্ভব, কারণ ড্রোন অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য উচ্চতা থেকে স্প্রে করতে পারে। এর ফলে পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবও কমে আসে এবং পানির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকটের এলাকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড্রোনের মাধ্যমে স্প্রে করার ফলে কীটনাশক ফসলের পাতার উভয় পৃষ্ঠে সমানভাবে পৌঁছায়, যা পোকা ও রোগ দমনে অধিকতর কার্যকর। DAE তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ড্রোন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করবে।

তবে, এই সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা এর 'সাশ্রয়ী সমাধান' হওয়ার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয় কৃষকদের জন্য একটি প্রধান অন্তরায়। একটি উন্নত কৃষি ড্রোনের দাম প্রায় ৫-১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। শুধু ড্রোন কেনা নয়, এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম যেমন অতিরিক্ত ব্যাটারি, চার্জার এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বেশ চড়া। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই উচ্চ ব্যয় কমানোর জন্য স্থানীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তাদের এক প্রাথমিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যন্ত্রাংশ আমদানি নির্ভরতা কমানো গেলে ড্রোনের দাম ৩০-৪০% পর্যন্ত হ্রাস করা সম্ভব। এছাড়া, ড্রোন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবলের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এবং নতুন প্রযুক্তির প্রতি অনীহা প্রায়শই দেখা যায়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ড্রোন ব্যবহারের ফলে রাসায়নিকের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর জোর দিচ্ছে, যাতে মাটির উর্বরতা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। অপরিকল্পিত বা ভুল পদ্ধতিতে ড্রোন ব্যবহার পরিবেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত এলাকায় রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়া বা উপকারী পতঙ্গের ক্ষতি সাধন। তাই, ড্রোন পরিচালনার জন্য কঠোর প্রোটোকল এবং পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা অপরিহার্য। BARC তাদের গবেষণায় এই দিকগুলো নিয়ে কাজ করছে, যাতে পরিবেশগত ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায় এবং ড্রোনের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়।

শুধু ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ড্রোন কেনাবেচা নয়, ড্রোন-ভিত্তিক স্প্রে পরিষেবা মডেলও বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কৃষকদের ব্যক্তিগতভাবে ড্রোন কেনার প্রয়োজন হবে না, বরং তারা নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন, যেমনটা ভারতের কিছু রাজ্যে সফলভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগের বোঝা কৃষকের উপর না পড়ে, বরং পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার উপর বর্তায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ফসলের জন্য, যেমন আলু, ভুট্টা, পাট এবং সবজি, ড্রোন স্প্রে করার কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। তাদের প্রারম্ভিক ফলাফলে দেখা গেছে, ড্রোন ব্যবহারের ফলে ফসলে রোগ ও পোকা দমনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একই সাথে ফসলের গুণগত মানও উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে, দুর্গম বা জলাবদ্ধ এলাকায় যেখানে মানুষের পক্ষে প্রবেশ করা কঠিন, সেখানে ড্রোন প্রযুক্তি ফসল সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। BRRI তাদের গবেষণায় ধানের বিভিন্ন রোগ, যেমন ব্লাস্ট বা ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট দমনে ড্রোনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে, যেখানে সময়মতো এবং সুনির্দিষ্ট স্প্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই পরিষেবা মডেলের জন্য একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ নীতি জরুরি, যা DAE কর্তৃক পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে যাতে কৃষকরা অতিরিক্ত ব্যয়ের শিকার না হন এবং সেবার মান নিশ্চিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে, এই প্রযুক্তি ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কৃষকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, যা একে 'ব্যয়বহুল বিলাসিতা' থেকে 'সাশ্রয়ী সমাধান'-এর দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম।

কার্যকারিতা ম্যানুয়াল স্প্রে পদ্ধতি ড্রোন স্প্রে পদ্ধতি
প্রতি একর স্প্রে সময় (গড়) ৩-৪ ঘণ্টা ৮-১০ মিনিট
শ্রমিকের প্রয়োজন (প্রতি একর) ২-৩ জন ০.৫ জন (১ জন পরিচালক একাধিক ড্রোন পরিচালনা করতে পারে)
কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস ০% (বেশি অপচয় ও অসম বিতরণ) ২০-২৫% (সুনির্দিষ্ট স্প্রে)
পানির ব্যবহার হ্রাস ০% (বেশি ব্যবহার) ৩০-৪০% (কম জলীয় পদার্থ প্রয়োজন)
প্রাথমিক বিনিয়োগ (গড়) ৳ ১,৫০০ - ৳ ২,৫০০ (সাধারণ স্প্রেয়ার) ৳ ৮,০০,০০০ - ৳ ১৫,০০,০০০ (উন্নত কৃষি ড্রোন)
স্বাস্থ্য ঝুঁকি উচ্চ (সরাসরি রাসায়নিকের সংস্পর্শ) নিম্ন (দূর থেকে পরিচালনা)
কারিগরি জ্ঞান নিম্ন উচ্চ (প্রশিক্ষণ প্রয়োজন)

উৎস: DAE ও BARC-এর পাইলট প্রকল্প সমীক্ষা, ২০২৩-২৪

সুপারিশ

  • সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর মাধ্যমে 'কৃষি আধুনিকীকরণ তহবিল' থেকে ড্রোন ক্রয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য ৫০% পর্যন্ত ভর্তুকি প্রদানের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করুক এবং স্থানীয় কৃষি সমবায় সমিতিগুলোকে ড্রোন পরিষেবা কেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করুক, যাতে কৃষকরা কম খরচে ড্রোন ব্যবহারের সুবিধা পান।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যৌথভাবে স্থানীয় জলবায়ু ও ফসলের বৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সাশ্রয়ী এবং সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য ড্রোন মডেল উদ্ভাবনে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করুক, বিশেষত দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করুক এবং এর কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করুক।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) সম্মিলিতভাবে ড্রোন ব্যবহার করে কীটনাশক ছিটানোর জন্য একটি বিস্তারিত জাতীয় নীতিমালা ও প্রমিত অপারেটিং পদ্ধতি (SOP) তৈরি করুক, যা ড্রোন অপারেটরদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করবে এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিবেশগত নিরাপত্তা ও রাসায়নিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator