ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালনে কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করার ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালনে কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করার ঘটনাটি আবারও দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সুশাসনের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও বিএসইসি নিয়মিতভাবে কোম্পানিগুলোকে এই কোড অনুসরণে বাধ্য করার চেষ্টা করছে, তবে বাস্তব চিত্র প্রায়শই ভিন্ন গল্প বলে। বিশেষ করে, পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, নিরীক্ষা কমিটির কার্যকারিতা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে এখনো ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এই ঘাটতি কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির অভাব নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলোতেও বাংলাদেশের সুশাসন সূচকে ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ডেটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অত্যাবশ্যক, যাতে বাস্তবতার নিরিখে কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করা যায়।

বাংলাদেশের করপোরেট গভর্ন্যান্সের কাঠামো মূলত কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং বিএসইসি কর্তৃক জারিকৃত কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ (যা পূর্বে ২০০৬ সালের কোড ছিল)-এর ওপর নির্ভরশীল। তবে, এই আইন ও কোডের বাস্তবায়ন পর্যায়ে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে; তারা পর্ষদের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারেন না, যা স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই ব্যক্তি একাধিক কোম্পানির পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা তাদের কার্যকারিতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা অনেক সময় আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির পথ প্রশস্ত করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (FICSD)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত জালিয়াতির সিংহভাগই দুর্বল কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের ফল। এই সমস্যাগুলো কেবল বেসরকারি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ (State-Owned Enterprises - SOEs) গুলোতেও একই ধরনের দুর্বলতা বিদ্যমান, যেখানে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব প্রায়শই প্রকট। এডিবি’র 'বাংলাদেশ কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি ২০২৩-২০২৭' দলিলে সুশাসন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা এই খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি স্পষ্ট স্বীকৃতি।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনি এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে যা এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধা দেয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদিও দুর্নীতি দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, তবে মামলা তদন্ত, অভিযোগ যাচাই-বাছাই এবং উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী দুদকের ক্ষমতা সুস্পষ্ট হলেও, রাজনৈতিক প্রভাব, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া এবং পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব অনেক সময় এর কার্যকারিতা সীমিত করে। বিশ্বব্যাংকের 'ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস' (WGI) অনুযায়ী, বাংলাদেশের 'কন্ট্রোল অফ করাপশন' (Control of Corruption) সূচকে বিগত এক দশকে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি, যা প্রমাণ করে যে, বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো হয়তো যথেষ্ট নয় অথবা সেগুলোর বাস্তবায়ন দুর্বল। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ (PPA) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮ (PPR) এর মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করা হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে টেন্ডার কারসাজি, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ প্রায়শই গণমাধ্যমে উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ সত্ত্বেও, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি একটি গভীর শিকড় গেড়ে থাকা সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যা দেশের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।

এই সমস্যাগুলোর মূলে রয়েছে জবাবদিহিতার অভাব এবং আইনি কাঠামোর দুর্বল প্রয়োগ। উদাহরণস্বরূপ, কোম্পানি আইনের অধীনে পরিচালকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও, বাস্তবে এর প্রয়োগ বিরল। একইভাবে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আচরণবিধি এবং শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নিয়মাবলী থাকলেও, ক্ষমতা অপব্যবহারের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা কম। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে বার্ষিক জিডিপি’র ২-৩% পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং সামাজিক অসমতা বৃদ্ধি এবং মৌলিক সেবা প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি স্ট্র্যাটেজি' (NIS) গ্রহণ করা হলেও, এর বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি। এডিবি’র বিভিন্ন প্রকল্পে সুশাসন উপাদানের ওপর জোর দেওয়া হলেও, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি শুধুমাত্র অর্থ আত্মসাৎ নয়, এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিকৃতি ঘটায়, মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি ও প্রভাবকে উৎসাহিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সক্ষমতা হ্রাস করে।

সূচক ২০১৮ সাল (শতাংশ র‍্যাঙ্ক) ২০২০ সাল (শতাংশ র‍্যাঙ্ক) ২০২২ সাল (শতাংশ র‍্যাঙ্ক)
World Bank WGI: কন্ট্রোল অফ করাপশন (বাংলাদেশ) ২৮.৩৭% ২৫.৪৮% ২৪.৫২%
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা নিষ্পত্তির হার (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী) ৪৫% ৪৮% ৪২%

উৎস: World Bank Worldwide Governance Indicators (WGI) এবং বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন (প্রতীকী ডাটা)।

সুপারিশ

  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর অধীনে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে। বিশেষ করে, উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি মামলার তদন্ত ও প্রসিকিউশনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন উইং-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং বিএসইসি'র কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করা এবং তাদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা আবশ্যক। একই সাথে, বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বেসরকারি খাতের কর্পোরেট গভর্ন্যান্স পরিপালনে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ (PPA) এবং সংশ্লিষ্ট রুলস-এর অধীনে সকল সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করতে হবে এবং প্রতিটি ধাপের তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত করতে হবে। এতে টেন্ডার কারসাজি রোধ হবে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) কর্তৃক নিয়মিত নিরীক্ষা ও তদারকির আওতায় আনতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator