জৈব বর্জ্য: ভাগাড়ের বোঝা থেকে কৃষকের সম্পদ - সার্কুলার অর্থনীতির রূপান্তর | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জৈব বর্জ্য: ভাগাড়ের বোঝা থেকে কৃষকের সম্পদ - সার্কুলার অর্থনীতির রূপান্তর

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
জৈব বর্জ্য: ভাগাড়ের বোঝা থেকে কৃষকের সম্পদ - সার্কুলার অর্থনীতির রূপান্তর
জৈব বর্জ্য: ভাগাড়ের বোঝা থেকে কৃষকের সম্পদ - সার্কুলার অর্থনীতির রূপান্তর
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ঢাকার মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ক্রমবর্ধমান বর্জ্যের পাহাড় এবং এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত উদ্বেগ পুনরায় দেশের জৈব বর্জ্য ব্...

সম্প্রতি ঢাকার মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ক্রমবর্ধমান বর্জ্যের পাহাড় এবং এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত উদ্বেগ পুনরায় দেশের জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দৈনিক উৎপন্ন হাজার হাজার টন বর্জ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই জৈব উপাদান, যা বর্তমানে শুধুমাত্র ভাগাড়ের বোঝা হয়ে পরিবেশ দূষণ করছে। অথচ এই বিশাল পরিমাণ জৈব বর্জ্যকে কৃষকের সম্পদে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে একটি কার্যকর সার্কুলার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যা একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে, তেমনি কৃষি উৎপাদন ও মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে জৈব সারের উপকারিতা নিয়ে গবেষণা ও প্রচার চালিয়ে এলেও, এর ব্যাপকভিত্তিক বাস্তবায়ন এখনও অধরা।

এই অব্যবহৃত জৈব বর্জ্য পচে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। একইসঙ্গে, বর্জ্য থেকে নিঃসৃত দূষিত তরল পদার্থ (লিচেট) মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব জনস্বাস্থ্য এবং কৃষি উৎপাদনশীলতার ওপর পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বর্জ্যকে 'সম্পদ' হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) তাদের গবেষণায় প্রমাণ করেছে যে, রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমে আসে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রচলন হয়। কিন্তু বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং জৈব সার উৎপাদনে বিনিয়োগের অভাব এবং কার্যকর নীতিমালার অনুপস্থিতি এই সম্ভাবনাকে এখনো পূর্ণতা দিতে পারেনি।

সার্কুলার অর্থনীতির মূলনীতি হলো 'বর্জ্যহীনতা' এবং 'সম্পদের পুনরুৎপাদন'। জৈব বর্জ্যকে জৈব সারে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া এই নীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শহর ও গ্রামীণ উভয় অঞ্চলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ (source segregation) এবং কম্পোস্টিং-এর মাধ্যমে উচ্চমানের জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। এটি শুধুমাত্র স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না, বরং কৃষকদের জন্য সুলভে উন্নত মানের সার সরবরাহ নিশ্চিত করবে। DAE ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রদর্শনী প্লট এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে জৈব সারের ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। তবে, এর একটি সমন্বিত জাতীয় রূপরেখা প্রয়োজন যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে কাজ করবে। BARC-এর তত্ত্বাবধানে BARI ও BRRI-এর গবেষণা ফলাফলকে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত প্রয়োগের জন্য একটি কার্যকর সম্প্রসারণ মডেল তৈরি করা অত্যাবশ্যক। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের 'কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১' এর আওতায় জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে এই রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে।

সূচক পরিমাণ/শতাংশ সাল/উৎস
বাংলাদেশে দৈনিক মোট কঠিন বর্জ্য উৎপাদন প্রায় ৩০,০০০ টন ২০২১ (পরিবেশ মন্ত্রণালয়)
মোট কঠিন বর্জ্যে জৈব বর্জ্যের অনুপাত প্রায় ৭০-৭৫% ২০২১ (পরিবেশ মন্ত্রণালয়)
জৈব সার উৎপাদন ক্ষমতা (আনুমানিক, বিদ্যমান অবকাঠামো) ৫-১০% (মোট জৈব বর্জ্যের) ২০২২ (BARC/DAE প্রতিবেদন)
DAE এর মাধ্যমে জৈব সার ব্যবহারকারী কৃষক (বর্ধিত) ৫০,০০০+ ২০২৩ (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর)
BARI/BRRI গবেষণায় জৈব সারের প্রভাবে ফসলের ফলন বৃদ্ধি ১০-১৫% (গড়) বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন, ২০২২-২৩

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রকাশনা।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১' এর অধীনে শহর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম্পোস্টিং প্ল্যান্ট স্থাপনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কে একটি সমন্বিত গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উন্নত মানের জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি এবং এর সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি উদ্ভাবন করবে, এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) সেই প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কর্মসূচির আয়োজন করবে।
  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং DAE কে জৈব সার উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং জৈব সার ব্যবহারকারী কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে, যাতে জৈব সারের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং একটি টেকসই বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator