মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর আওতায় গত পাঁচ বছরে দায়...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর আওতায় গত পাঁচ বছরে দায়েরকৃত মামলার নিষ্পত্তির হার মাত্র ১৫%। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো ও তার বাস্তবায়নে বিদ্যমান গভীর চ্যালেঞ্জের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। একদিকে যেমন অবৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, অন্যদিকে মানব পাচারের শিকার অসংখ্য মানুষ হারাচ্ছেন তাদের জীবন, স্বপ্ন ও মর্যাদা। এই প্রেক্ষাপটে, মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার একটি নিবিড় বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যক।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী শ্রমিক (নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ উল্লেখযোগ্য। তবে, এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগে এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড (WEWB) এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জরুরি। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমানো মানুষের সংখ্যা গড়ে প্রায় ৫০ হাজার, যাদের একটি বড় অংশ মানব পাচারের শিকার হয়। এই অবৈধ অভিবাসনের পেছনে প্রলুব্ধকারী চক্রের মূলধন বিনিয়োগ এবং তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বৃদ্ধি না পেলে এই আইনের প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন।

মানব পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একদিকে যেমন এটি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে অবৈধ পথে অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, মানব পাচার প্রতিরোধে বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন সম্ভব। বিশেষ করে, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে পারলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং তাদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন চ্যানেল তৈরির জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক সচেতনতামূলক কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো এবং তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদানও মানব পাচার প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উদ্যোগগুলো মানব পাচার চক্রের প্রলুব্ধ করার ক্ষমতাকে দুর্বল করবে এবং কর্মীদের ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করবে।

সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর আওতায় দায়েরকৃত মামলা ৬৫০ ৫৯০ ৭২০ ৮১০ ৭৮০
নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা ৭৮ ৮৫ ১০৫ ১২০ ১১০
ভুক্তভোগী উদ্ধার ও পুনর্বাসন ১৫০০ ১৪৫০ ১৬৫০ ১৭০০ ১৬২০
অবৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া আনুমানিক অর্থ (বিলিয়ন টাকা) ১.২ ১.৫ ১.৮ ২.০ ২.২

উৎস: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংক (আর্থিক পাচারের তথ্য)

সুপারিশ

  • বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর অধীনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং বিচারকদের জন্য মানব পাচার সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এর পাশাপাশি, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে এই মামলাগুলোতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা।
  • বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী শ্রমিক (নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB) এর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ করতে হবে, যার মধ্যে উন্নত ডেটাবেজ সিস্টেম স্থাপন এবং অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা অন্তর্ভুক্ত।
  • মানব পাচার প্রতিরোধে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ সরকারকে World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় একটি আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যা পাচারকারীদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক চিহ্নিতকরণ ও দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং পাচারকৃতদের দ্রুত প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator