কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: 'কর্মচারী সন্তুষ্টি' বনাম 'কর্মচারী সম্পৃক্ততা' – কোথায় পিছিয়ে আমরা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: 'কর্মচারী সন্তুষ্টি' বনাম 'কর্মচারী সম্পৃক্ততা' – কোথায় পিছিয়ে আমরা?

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: 'কর্মচারী সন্তুষ্টি' বনাম 'কর্মচারী সম্পৃক্ততা' – কোথায় পিছিয়ে আমরা?
কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: 'কর্মচারী সন্তুষ্টি' বনাম 'কর্মচারী সম্পৃক্ততা' – কোথায় পিছিয়ে আমরা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গত পাঁচ বছরে দেশের কর্মীবাহিনীর মধ্যে 'কাজের প্রতি সন্তুষ্টি'র...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গত পাঁচ বছরে দেশের কর্মীবাহিনীর মধ্যে 'কাজের প্রতি সন্তুষ্টি'র হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেলেও, 'কাজের প্রতি সম্পৃক্ততা' বা 'Employee Engagement' এর হার মাত্র ৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর বিভাগের জন্য একটি গভীর চিন্তার বিষয়। কারণ, কেবল বেতন-ভাতা বা ভালো কর্মপরিবেশের মতো বাহ্যিক সুবিধা দিয়ে কর্মীদের সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব হলেও, তাদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন গভীরতর সম্পৃক্ততা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কর্মীরা চাকরিতে উপস্থিত থাকলেও তাদের মনন ও উদ্ভাবনী শক্তি প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর লক্ষ্যের সাথে একাত্ম হতে পারছে না। এই বৈষম্য বাংলাদেশের কর্মপরিবেশে একটি সুপ্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা কেবল উৎপাদনশীলতা নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে 'কর্মচারী সন্তুষ্টি' এবং 'কর্মচারী সম্পৃক্ততা'র মধ্যেকার এই সূক্ষ্ম পার্থক্য প্রায়শই অনুধাবন করা হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠানই মনে করে, ভালো বেতন, বোনাস, স্বাস্থ্য বীমা এবং একটি আরামদায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করলেই কর্মীরা খুশি থাকবেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করবেন। এটি কর্মীর প্রাথমিক সন্তুষ্টির জন্য অপরিহার্য হলেও, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ প্রেরণা বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আবেগিক বন্ধন তৈরি করে না। উদাহরণস্বরূপ, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মাধ্যমে যে বিশাল সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে, তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু এই দক্ষ জনশক্তির মধ্যে কতজন তাদের কাজের প্রতি সত্যিকার অর্থে অনুপ্রাণিত এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত, সেই প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, নতুন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত কর্মীরাও একই ধরনের গতানুগতিক কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি অনুভব করেন, যা তাদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেয়।

এই সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি নিহিত আছে কর্পোরেট লিডারশিপের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এইচআর বিভাগের কৌশলগত পরিবর্তনে। প্রচলিত এইচআর মডেল, যা মূলত প্রশাসনিক কাজ এবং নিয়োগ-ছাঁটাই প্রক্রিয়ার উপর জোর দেয়, তা এখন অপ্রতুল। আধুনিক এইচআরকে কর্মীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিকাশের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা শেষে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করছে, যাদের অধিকাংশই নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে আসে। ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন (UGC) অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা এই গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে তাদের মেধা ও প্রতিভার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। যদি কর্পোরেট নেতৃত্ব কর্মীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে, এবং তাদের জন্য ক্যারিয়ার বিকাশের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করে, তবেই তারা কেবল সন্তুষ্ট নয়, বরং গভীরভাবে সম্পৃক্ত অনুভব করবে। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি যেখানে কর্মীরা নিজেদের কেবল প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ নয়, বরং এর সাফল্যের অংশীদার মনে করে।

বছর কর্মচারী সন্তুষ্টি (%) কর্মচারী সম্পৃক্ততা (%) দক্ষ জনশক্তি প্রশিক্ষণ (NSDA এর আওতায়, লক্ষ্য) উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব (আনুমানিক %)
২০১৯ ৬২ ৩৫ ১,৫০,০০০ ১৩.৯
২০২০ ৬০ ৩২ ১,৩০,০০০ ১৫.২
২০২১ ৬৭ ৩৮ ১,৮০,০০০ ১১.৫
২০২২ ৭২ ৪০ ২,১০,০০০ ৯.৮
২০২৩ ৭৭ ৪০ ২,৫০,০০০ ৯.০

উৎস: বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) প্রতিবেদন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) শ্রমশক্তি জরিপ, এবং কর্পোরেট এইচআর সমীক্ষা (কাল্পনিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে NSDA এর 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি'র সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে 'সফট স্কিল' এবং 'লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট' মডিউল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে কর্মীরা কেবল প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানেও পারদর্শী হয়ে ওঠে।
  • UGC এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে তাদের পাঠ্যক্রমে এমন 'প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা' মডেল চালু করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করবে এবং তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী মানসিকতা ও দলগত কাজের প্রতি সম্পৃক্ততা তৈরি করবে, যা পরবর্তীতে কর্পোরেট কর্মজীবনে প্রতিফলিত হবে।
  • BANBEIS এবং SEIP এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'জাতীয় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা পোর্টাল' তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের কর্মজীবনের পথচিত্র (Career Pathway) এবং দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগগুলো নিয়মিত আপডেট করবে, যা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার ও সম্পৃক্ততা তৈরিতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator