ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে ভোক্তা অধিকারের ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে ভোক্তা অধিকারের ভবিষ্যৎ

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে ভোক্তা অধিকারের ভবিষ্যৎ
ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে ভোক্তা অধিকারের ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২১ সালের ই-কমার্স কেলেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ...

সম্প্রতি, ২০২১ সালের ই-কমার্স কেলেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করা এবং অগ্রিম অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে অন্তত ৩০০টির বেশি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৪০% বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স এবং এফ-কমার্স খাতে ডেলিভারি জট কেবল একটি লজিস্টিক্যাল সমস্যা নয়, এটি ভোক্তা অধিকারের জন্য একটি প্রকট হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা ডিজিটাল বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত কোভিড-১৯ মহামারির সময় অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাব এবং বিক্রেতাদের জবাবদিহিতার ঘাটতি এই খাতের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে এফ-কমার্স, অর্থাৎ ফেসবুক-ভিত্তিক বাণিজ্য, যেখানে বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ অনিবন্ধিত এবং প্রায়শই তাদের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা বা ট্রেড লাইসেন্স থাকে না, সেখানে ভোক্তা সুরক্ষার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও সরাসরি ই-কমার্স ডেলিভারি নিয়ে কাজ করে না, তবে এই খাতের অনিয়মগুলো সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে, যা পরোক্ষভাবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তার আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন তা কেবল ভোক্তা অধিকারই লঙ্ঘন করে না, বরং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, যা BSEC-এর জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি বা এই খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ডেলিভারি জটের মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে দুর্বল লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক, দক্ষ জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি, অনলাইন মার্চেন্টদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত ডেলিভারি সময়সীমা পূরণে ব্যর্থতা। এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (EPB) যদিও প্রধানত রপ্তানি বাণিজ্য নিয়ে কাজ করে, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ই-কমার্সের দুর্বলতাগুলো পরোক্ষভাবে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি স্থানীয় ডেলিভারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অনলাইন রপ্তানি প্রসারেও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর গবেষণায় দেখা গেছে, ই-কমার্স খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে প্রায়শই বিক্রেতারা অগ্রিম অর্থ নিয়ে পণ্য সরবরাহ করে না বা নিম্নমানের পণ্য পাঠায়, যার ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এই খাতের রাজস্ব আদায় নিয়ে কাজ করলেও, অনিবন্ধিত এফ-কমার্স বিক্রেতাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে, একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তারা অনিরাপদ লেনদেনের শিকার হচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা সংশ্লিষ্ট ডেটা/সিদ্ধান্ত
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-কমার্স নীতিমালা প্রণয়ন ও ভোক্তা অধিকার তদারকি ২০২১ সালে 'ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা' জারি; ২০২৩ সালে ৩০০+ ই-কমার্স অভিযোগ নিষ্পত্তি।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) ভোক্তা অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি ২০২৩ সালে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৪০% বৃদ্ধি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ই-কমার্স ও এফ-কমার্স থেকে রাজস্ব আদায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ই-কমার্স লেনদেন থেকে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় (প্রত্যাশিত)।
এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (EPB) ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স প্রসারে সহায়তা ২০২৩ সালে বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি ২% বৃদ্ধি (লক্ষ্যমাত্রা)।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) নীতি গবেষণা ও সুপারিশ ২০২২ সালের ই-কমার্স সংক্রান্ত গবেষণায় ভোক্তা আস্থার সংকট ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত।

উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, DNCRP, NBR বার্ষিক প্রতিবেদন, EPB, CPD গবেষণা প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা' ২০২৪ সালে সংশোধন করে এফ-কমার্স বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স এবং একটি সহজবোধ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সাথে সংযুক্ত থাকবে।
  • জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) কে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি দ্রুত ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (যেমন, ১৫ কার্যদিবস) অভিযোগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে, ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা আরোপের বিধান রাখতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সাথে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে সকল ই-কমার্স ও এফ-কমার্স বিক্রেতাদের বাধ্যতামূলক ভ্যাট/ট্যাক্স নিবন্ধন থাকবে এবং তাদের লেনদেনের উপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator