প্লাস্টিক বর্জ্য: একক ব্যবহারের অভিশাপ ও বৃত্তাকার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্লাস্টিক বর্জ্য: একক ব্যবহারের অভিশাপ ও বৃত্তাকার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
প্লাস্টিক বর্জ্য: একক ব্যবহারের অভিশাপ ও বৃত্তাকার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
প্লাস্টিক বর্জ্য: একক ব্যবহারের অভিশাপ ও বৃত্তাকার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে একক ব্যবহারযোগ্য প...

সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উদ্বেগজনক চিত্র কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত। বিশেষ করে, খাদ্য প্যাকেজিং এবং কৃষি উপকরণের প্লাস্টিকে অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের মাটি ও পানির গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুসংগঠিত বৃত্তাকার অর্থনীতি মডেলের দিকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য, যেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হবে।

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং নগরায়নের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষত, কৃষি খাতে ব্যবহৃত পলিথিন শিট, সেচ পাইপ এবং কীটনাশকের বোতল থেকে উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির উর্বরতা হ্রাস করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ, যা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানবদেহের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। যদিও প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় সরকার কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন ২০০২ সালের পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ আইন, কিন্তু বাস্তবায়ন ও তদারকির অভাবে এর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বৃত্তাকার অর্থনীতির মূলনীতি হলো 'কমিয়ে আনা, পুনরায় ব্যবহার করা এবং পুনর্ব্যবহার করা'। এই নীতি অনুসরণ করে, প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন পর্যায়েই দীর্ঘস্থায়ী ডিজাইন এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত সার ও কীটনাশকের প্যাকেজিংয়ে বায়োডিগ্রেডেবল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের বাধ্যতামূলক নীতি চালু করা যেতে পারে। একইসঙ্গে, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হবে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল, যেখানে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা হবে। শিল্প খাতকে উৎসাহিত করতে হবে যেন তারা তাদের পণ্য উৎপাদনে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করে এবং তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কৃষকদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যেখানে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উপাদান যেমন – পাটের তৈরি পণ্য বা কম্পোস্টেবল উপকরণ ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হবে। এছাড়াও, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি বা অন্যান্য মূল্যবান পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে, যা শুধু পরিবেশ দূষণই কমাবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জৈব-পচনশীল কৃষি উপকরণের উপর গবেষণা জোরদার করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিক নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। এই ধরনের উদ্ভাবনী সমাধান এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

প্লাস্টিক বর্জ্য উপাত্ত (বাংলাদেশ) ২০১৮ (টন/বছর) ২০২০ (টন/বছর) ২০২২ (টন/বছর)
মোট উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য ৮,০০,০০০ ১০,০০,০০০ ১২,০০,০০০
একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য (মোটের %) ৩৭% ৪০% ৪২%
পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য (মোটের %) ২৭% ৩০% ৩২%
কৃষি খাতে প্লাস্টিক ব্যবহার (আনুমানিক) ৮৫,০০০ ১,১০,০০০ ১,৩৫,০০০

উৎস: বিশ্বব্যাংক (২০২২), পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে 'একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৫' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উৎপাদন ও বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর অধীনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হবে।
  • কৃষি মন্ত্রণালয়কে DAE, BARI এবং BRRI-এর মাধ্যমে কৃষকদের জন্য প্লাস্টিকের পরিবেশবান্ধব বিকল্প (যেমন: বায়োডিগ্রেডেবল মালচ ফিল্ম, পাটের তৈরি চারা ট্রে) ব্যবহারের উপর ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কৃষি পণ্যের প্যাকেজিংয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ বাধ্যতামূলক করার নীতি চালু করতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি জাতীয় বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কেন্দ্র স্থাপন করা হবে এবং এর অর্থায়নের জন্য একটি 'সার্কুলার ইকোনমি ফান্ড' গঠন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator