আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন উন্নয়ন: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন উন্নয়ন: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন উন্নয়ন: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন উন্নয়ন: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের পর, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত...

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের পর, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্তাধীন প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই ঋণ প্যাকেজের শর্তাবলীতে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও সরকার এই ঋণকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অপরিহার্য বলে অভিহিত করেছে, সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের শর্তগুলো দেশের নীতি নির্ধারণী ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। বিশেষত, বৈদেশিক মুদ্রা নীতি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার মতো কোর বিষয়গুলোতে বহিরাগত নির্দেশনার প্রভাব বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এই শর্তাধীন ঋণ শুধুমাত্র আইএমএফের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতারাও তাদের অর্থায়নে প্রায়শই সুনির্দিষ্ট নীতিগত সংস্কারের শর্ত আরোপ করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সুশাসন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলিতে শর্ত থাকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার প্রকল্পগুলোতে প্রায়শই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির শর্ত থাকে, যা সরাসরি জনজীবনে প্রভাব ফেলে। এসব শর্ত একদিকে যেমন অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে, তেমনি অন্যদিকে এগুলো দেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং জনগণের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায়শই আন্তর্জাতিক ফোরামে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নমনীয় ঋণ শর্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে, তবে বাস্তব ক্ষেত্রে ঋণ প্রাপ্তির জন্য কঠোর শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এর ফলে, দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়নে বিদেশি প্রভাব একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক মডেল তৈরি এবং তার বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই শর্তাধীন উন্নয়ন মডেলের প্রভাব বহুমাত্রিক। এর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রভাব। উদাহরণস্বরূপ, আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংককে মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় আরও বাজার-ভিত্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হচ্ছে। এর ফলে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে। একই সাথে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ কমানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। এমনকি, সরকারের বাজেট ঘাটতি কমাতে ভর্তুকি কমানোর শর্তগুলো বিদ্যুৎ, সার ও জ্বালানি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, যার ফলস্বরূপ এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি এবং অর্থনৈতিক সমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। একই সময়ে, আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation) এর মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের শর্তগুলো প্রায়শই আঞ্চলিক উন্নয়ন এজেন্ডাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে এই বহিরাগত প্রভাবের মাত্রা UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি পালনেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক ভূমিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

ঋণদাতা সংস্থা ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাপ্ত ঋণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রধান শর্তাবলী (উদাহরণ) সার্বভৌমত্বের উপর সম্ভাব্য প্রভাব
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ০.৭৮ (প্রথম কিস্তি) জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা। মুদ্রানীতি, জ্বালানি নীতি ও ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণের উপর সরাসরি প্রভাব।
বিশ্বব্যাংক ২.২ (আনুমানিক) পরিবেশগত সুরক্ষা, সুশাসন, সরকারি ক্রয় পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ। উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১.৭ (আনুমানিক) বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, অবকাঠামো প্রকল্পে লাভজনকতার শর্ত। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের নীতি প্রণয়নে প্রভাব।

উৎস: বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা সংস্থাগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২-২৩)

সুপারিশ

  • জাতীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা নীতি ২০১৯-এর অধীনে একটি শক্তিশালী আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হোক, যার নেতৃত্বে থাকবে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই কমিটি আন্তর্জাতিক ঋণ প্রস্তাবনাগুলোর শর্তাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রাখবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার এবং মুদ্রানীতি নির্ধারণে আরও স্বাধীনতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন (যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২) সংশোধন করে এর কার্যকারিতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো হোক। একই সাথে, দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক মডেল এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হোক।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একটি সম্মিলিত আঞ্চলিক ঋণদাতা ফোরাম বা উন্নয়ন তহবিল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার কঠোর শর্তাবলী থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। এই ফোরাম আঞ্চলিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে অর্থায়ন করবে, যা সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator