ডিজিটাল কন্টেন্টের কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব-ফেসবুকের যুগে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল কন্টেন্টের কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব-ফেসবুকের যুগে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
ডিজিটাল কন্টেন্টের কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব-ফেসবুকের যুগে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল কন্টেন্টের কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব-ফেসবুকের যুগে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল 'গানের ডালি'-এর প্রায় দুই শতাধিক গান অননুমোদিতভাবে আপলোড করার অভিযোগে 'সুর সপ্তক' নামক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল 'গানের ডালি'-এর প্রায় দুই শতাধিক গান অননুমোদিতভাবে আপলোড করার অভিযোগে 'সুর সপ্তক' নামক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কপিরাইট অফিস স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই ঘটনাটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মেধা স্বত্বের সুরক্ষার দুর্বলতা এবং লঙ্ঘনের ব্যাপকতা সম্পর্কে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫ ও ২০২৩) অনুযায়ী, ডিজিটাল কন্টেন্টের অবৈধ ব্যবহার বা পাইরেসি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে এর কার্যকর প্রয়োগ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, স্থানীয় কন্টেন্ট নির্মাতাদের মেধা স্বত্ব রক্ষায় বিদ্যমান আইন ও প্রযুক্তির সমন্বয়হীনতা প্রতিনিয়ত ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

ডিজিটাল কন্টেন্টের কপিরাইট সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় বাধাগুলির মধ্যে একটি হলো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলির সাথে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতা। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল কন্টেন্ট পাইরেসির কারণে বছরে গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের। স্থানীয় কন্টেন্ট নির্মাতারা তাদের সৃষ্টিকর্ম যখন ইউটিউব বা ফেসবুকে আপলোড করেন, তখন প্রায়শই তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক সেই কন্টেন্ট অননুমোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে, ইউটিউব ও ফেসবুকের নিজস্ব কপিরাইট সুরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন Content ID) থাকলেও, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নির্মাতাদের জন্য এই প্রক্রিয়াগুলি প্রায়শই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। কপিরাইট অফিস, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করলেও, তাদের পক্ষে প্রতিটি অননুমোদিত কন্টেন্ট শনাক্ত করে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলিতে তা সরিয়ে ফেলার জন্য কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনকারীরা প্রায়শই পার পেয়ে যায় এবং কন্টেন্ট নির্মাতারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, যা নতুন কন্টেন্ট তৈরিতে নিরুৎসাহিত করে।

আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও, ডিজিটাল কন্টেন্টের কপিরাইট লঙ্ঘনের কারণে সৃষ্টিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কপিরাইট লঙ্ঘনের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি এটি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতিতে (Creative Economy) প্রায় ১৫-২০% প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করে। বাংলাদেশে, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, নাটক এবং শিক্ষামূলক কন্টেন্টের মতো ডিজিটাল পণ্যগুলো প্রতিনিয়ত কপিরাইট লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে, ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করে মুক্তিপ্রাপ্ত কন্টেন্টের পাইরেসি ব্যাপক আকার ধারণ করে। অবৈধভাবে আপলোড করা কন্টেন্টগুলি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে মূল কন্টেন্টের বাজার মূল্য এবং ভিউয়ারশিপ কমে যায়। বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যখন উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করছে, তখন এই ধরনের কপিরাইট লঙ্ঘন মেধাবী তরুণদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কন্টেন্ট তৈরি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। বিদ্যমান কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী, ডিজিটাল মিডিয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু ধারা থাকলেও, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে এর প্রয়োগে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সাইবার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল বা কপিরাইট বোর্ড এক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে মামলার দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং বিচার প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

সাল কপিরাইট অফিসে নিবন্ধিত ডিজিটাল কন্টেন্ট (আনুমানিক) কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ (আনুমানিক) নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগ (আনুমানিক)
২০১৮ ৫,০০০ ৮০০ ১০০
২০১৯ ৭,৫০০ ১,২০০ ১৫০
২০২০ ১০,০০০ ১,৮০০ ২০০
২০২১ ১২,৫০০ ২,৫০০ ২৫০
২০২২ ১৫,০০০ ৩,২০০ ৩০০
২০২৩ ১৭,৫০০ ৪,০০০ ৩৫০

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন (আনুমানিক গড়)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইউটিউব, ফেসবুকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির সাথে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করা উচিত। এই সমঝোতার মাধ্যমে একটি দ্রুত এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব হবে, যেখানে বাংলাদেশের কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগগুলি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাচাই ও অপসারণ করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৩)-এর অধীনে একটি বিশেষ ডিজিটাল কপিরাইট মনিটরিং ইউনিট গঠন করতে পারে। এই ইউনিটটি অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিতে অবৈধ কন্টেন্ট শনাক্ত করবে এবং কপিরাইট অফিসের সাথে সমন্বয় করে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল কন্টেন্টের মেধা স্বত্ব ও কপিরাইট আইন সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের মাধ্যমে কন্টেন্ট নির্মাতাদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা উচিত, যাতে তারা তাদের মেধা স্বত্ব রক্ষায় বিদ্যমান আইনগত ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে অবগত হতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator