২০২২ সালের জুনে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) কর্তৃক প্রকাশিত 'Measuring Digital Development: Facts and Figures 2022' প্রতিবেদনে উদীয়মান স্পেস-টেক অর্থনীতির একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ স্থান পেয়েছে, যা বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) পরিচালিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতি ২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণ স্পেস-টেক খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাংলাদেশের প্রথম ভূ-স্থির যোগাযোগ উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সফল উৎক্ষেপণ এবং পরবর্তীতে এর বাণিজ্যিকীকরণ প্রক্রিয়া দেশের মহাকাশ প্রযুক্তির যাত্রায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হলেও, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলনামূলক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে একটি নিবিড় পর্যালোচনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্প্রচার, টেলিযোগাযোগ এবং ডেটা কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেলেও, এর বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর অবস্থান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যেখানে ভারত তার 'ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন' (ISRO) এর মাধ্যমে বহু দশক ধরে মহাকাশ গবেষণায় বিনিয়োগ করে চলেছে এবং বর্তমানে বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ সেবায় একটি উল্লেখযোগ্য অংশীদার, সেখানে বাংলাদেশ এখনো শুধুমাত্র একটি যোগাযোগ উপগ্রহের মালিকানা ও পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ইতোমধ্যে একাধিক মহাকাশযান উৎক্ষেপণ, চন্দ্রযান ও মঙ্গলযান মিশন পরিচালনা করেছে এবং নিজস্ব নেভিগেশন সিস্টেম (NavIC) গড়ে তুলেছে, যা আঞ্চলিক উপগ্রহভিত্তিক সেবায় তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশন (SPARRSO) মূলত আর্থ অবজারভেশন ডেটা বিশ্লেষণ এবং গবেষণা কার্যক্রমে জড়িত, যা সরাসরি স্যাটেলাইট নির্মাণ বা উৎক্ষেপণ সক্ষমতা অর্জনের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। এই তুলনামূলক প্রেক্ষাপটে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ২৬টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে প্রায় ১৪-১৫টি স্থানীয় চ্যানেল এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে এর ট্র্যান্সপন্ডার লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হয়নি। প্রতিযোগী দেশগুলো, যেমন শ্রীলঙ্কা (SupremeSAT-1) এবং পাকিস্তান (PakSat-1R), তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আর্থিক বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
স্পেস-টেক খাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা শুধুমাত্র যোগাযোগ স্যাটেলাইটে সীমাবদ্ধ না রেখে দূর অনুধাবন (Remote Sensing) এবং ভূ-পর্যবেক্ষণ (Earth Observation) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রসারিত হতে পারে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও, আন্তর্জাতিক বাজারে স্টারলিংক (Starlink) এবং ওয়ানওয়েব (OneWeb) এর মতো বৃহৎ কোম্পানিগুলো লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন নিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে, যা ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটের (যেমন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১) বাজার দখল করতে পারে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে এই উদীয়মান প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে শুধুমাত্র বিদেশী স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরতা হ্রাস করে দেশীয় স্পেস-টেক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হবে। এর মধ্যে মাইক্রোস্যাটেলাইট বা কিউবস্যাট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, যা কম খরচে তৈরি ও উৎক্ষেপণ করা যায়, এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও রিমোট সেন্সিং গবেষণাকে উৎসাহিত করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগগুলো দেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের মধ্যে মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব স্যাটেলাইট নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করবে, যা আন্তর্জাতিক স্পেস-টেক বাজারে বাংলাদেশের একটি সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
| সূচক | বাংলাদেশ (বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১) | ভারত (ISRO) | পাকিস্তান (PakSat-1R) |
|---|---|---|---|
| প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সাল | ২০১৮ | ১৯৭৫ (আর্যভট্ট), ১৯৮১ (অ্যাপল) | ২০১১ (PakSat-1R) |
| নিজস্ব উৎক্ষেপণ সক্ষমতা | নেই | আছে (PSLV, GSLV) | নেই (চীন থেকে উৎক্ষেপণ) |
| মোট পরিচালিত স্যাটেলাইটের সংখ্যা | ১ (যোগাযোগ) | ১০০+ (যোগাযোগ, দূর অনুধাবন, নেভিগেশন, গবেষণা) | ৩ (যোগাযোগ, দূর অনুধাবন) |
| বার্ষিক মহাকাশ বাজেট (আনুমানিক, বিলিয়ন USD) | ০.০৩-০.০৫ (পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) | ১.৭-২.০ | ০.০২-০.০৩ |
| ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার হার (বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, স্থানীয়) | ৫০-৬০% (২০২৪) | ৯৯% (বিভিন্ন স্যাটেলাইট) | ৮০-৮৫% |
| আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবহার | সীমিত | উল্লেখযোগ্য (উৎক্ষেপণ সেবা, ডেটা বিক্রয়) | সীমিত |
উৎস: ITU Measuring Digital Development 2022, ISRO Annual Report 2023, BSCL বার্ষিক প্রতিবেদন 2023, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি জাতীয় স্পেস-টেক রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে শুধু যোগাযোগ স্যাটেলাইট নয়, বরং ভূ-পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন এবং মাইক্রোস্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। এই রোডম্যাপে SPARRSO এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সাথে যৌথ গবেষণা প্রকল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ এবং নীতি সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য।
- BTRC কে দেশের বেসরকারি খাতকে স্পেস-টেক ইকোসিস্টেমে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করতে হবে, যেখানে ট্যাক্স হলিডে, সহজ শর্তে ঋণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সুযোগ থাকবে। একই সাথে, স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড এবং অন্যান্য স্পেস-ভিত্তিক সেবার জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক লাইসেন্সিং ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা উচিত, যা উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।
- BSCL এর বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে (যেমন নেপাল, ভুটান, ফিলিপাইন) ট্র্যান্সপন্ডার লিজ চুক্তির জন্য একটি সক্রিয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে এবং এর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের জন্য নিজস্ব জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের উপর জোর দিয়ে একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে।