জলবায়ু অভিবাসন ও বাংলাদেশের উপকূল: ডুবে যাওয়া স্বপ্ন বনাম প্রতিরোধের কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু অভিবাসন ও বাংলাদেশের উপকূল: ডুবে যাওয়া স্বপ্ন বনাম প্রতিরোধের কৌশল

রাসেল মাহমুদ  avatar   
রাসেল মাহমুদ
জলবায়ু অভিবাসন ও বাংলাদেশের উপকূল: ডুবে যাওয়া স্বপ্ন বনাম প্রতিরোধের কৌশল
জলবায়ু অভিবাসন ও বাংলাদেশের উপকূল: ডুবে যাওয়া স্বপ্ন বনাম প্রতিরোধের কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে প...

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ হার। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় এলাকা থেকে উঠে আসবে, যাদের জীবন-জীবিকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার আগ্রাসনে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। যদিও এই অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বৈশ্বিক অভিবাসন সংকটকে সরাসরি প্রভাবিত করে না, তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং মানবিক সহায়তার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই জলবায়ু অভিবাসনকে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবিক ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রমের প্রবণতা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা যায়, গত দুই দশকে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার প্রায় ৭ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে ভিটেমাটি হারিয়েছে, যাদের অধিকাংশই জীবিকার সন্ধানে ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে পাড়ি জমিয়েছে। তবে, অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের এই ধারা দেশের শহরাঞ্চলে অপরিকল্পিত বস্তি এবং অবকাঠামোগত চাপ তৈরি করছে, যা সামাজিক সংহতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই অভিবাসীরা প্রায়শই মানব পাচারকারী চক্রের সহজ শিকারে পরিণত হয়, যারা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে, বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারে অবৈধভাবে প্রবেশ করায়। এই আন্তঃসীমান্ত মানব পাচার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) প্রায়শই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক করে, যাদের অনেকেই জলবায়ু অভিবাসনের শিকার। এই সমস্যা মোকাবিলায় আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং SAARC (South Asian Association for Regional Cooperation) এর প্ল্যাটফর্মে কার্যকর আলোচনা এবং সমন্বিত পদক্ষেপের অভাব সুস্পষ্ট।

জলবায়ু অভিবাসন কেবল একটি মানবিক সংকট নয়, এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় হুমকি। মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অবৈধ অভিবাসন বৃদ্ধির আশঙ্কায় ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। UN Peacekeeping মিশনগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জাতিগত সংঘাত নিরসনে কাজ করলেও, জলবায়ু অভিবাসনজনিত নতুন ধরনের সংঘাত মোকাবেলায় তাদের ম্যান্ডেট বা সক্ষমতা এখনও সীমিত। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জলবায়ু অভিবাসনকে 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' (ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি) এর আওতায় এনে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছে। তবে, এই দাবির বাস্তবায়ন এখনও পর্যন্ত আশানুরূপ হয়নি। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অভিযোজন কৌশল এবং স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো নির্মাণে যে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার সিংহভাগই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া জলবায়ু অভিবাসনকে একটি টেকসই সমাধান দেওয়া অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতদের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, যা বিদ্যমান আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনগুলোর আওতায় পুরোপুরি পড়ে না।

প্রতিবেদনের উৎস সাল বিষয়বস্তু মূল তথ্য/পরিসংখ্যান
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) ২০২১ জলবায়ু অভিবাসন পূর্বাভাস ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৩ লাখ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসী
বিশ্বব্যাংক ২০১৯ উপকূলীয় বাস্তুচ্যুতি গত ২ দশকে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ৭ লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছে
অভিবাসন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা (IOM) ২০২৩ জলবায়ু অভিবাসন ও মানব পাচার জলবায়ু অভিবাসীদের মধ্যে ২৭% মানব পাচার চক্রের ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২২ আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি জলবায়ু অভিবাসনকে 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' এর আওতায় আনার দাবি

উৎস: UNEP, World Bank, IOM, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো প্রণয়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে, যা 'গ্লোবাল কম্প্যাক্ট ফর সেফ, অর্ডারলি অ্যান্ড রেগুলার মাইগ্রেশন' এর মতো বিদ্যমান চুক্তিগুলোর পরিপূরক হবে এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে।
  • BIMSTEC এবং SAARC এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে, যেখানে আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু অভিবাসন এবং মানব পাচার রোধে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ অপারেশন পরিচালনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'রিজিওনাল ফ্রেমওয়ার্ক অন ক্লাইমেট মাইগ্রেশন' তৈরি করা হবে।
  • UN Peacekeeping মিশনগুলোর ম্যান্ডেটে জলবায়ু-জনিত সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি মোকাবেলা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, বিশেষ করে এই মিশনগুলোর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জলবায়ু অভিবাসন ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাসেল মাহমুদ

রাসেল মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator