মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণ...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে প্রতিদিন প্রবাহিত প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের মূল্যে, যা জানুয়ারী ২০২৪-এর শুরুতে প্রতি ব্যারেল ৭৭ ডলার থেকে বেড়ে ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি ৮২ ডলার অতিক্রম করেছে, যদিও তা প্রাথমিকভাবে প্রত্যাশিত ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল উৎপাদনকারী দেশগুলোকেই নয়, বরং তেল আমদানিকারক দেশ, যেমন বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি ক্রয়ের ফলে ভর্তুকি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। এই অস্থিরতা কেবল জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না, বরং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সিদ্ধান্তগুলোকেও প্রভাবিত করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা, বৈশ্বিক শিপিং রুটগুলোতে গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এই হামলার কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি সুয়েজ খাল এবং লোহিত সাগরের বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অফ গুড হোপ রুট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিবহন ব্যয় এবং সময় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে। উদাহরণস্বরূপ, লোহিত সাগর এড়িয়ে ইউরোপগামী একটি ট্যাঙ্কারের যাত্রা ১৫-২০ দিন অতিরিক্ত সময় নিচ্ছে এবং প্রতি ট্রিপে অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ ডলারের জ্বালানি খরচ যোগ হচ্ছে। এই বর্ধিত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। উপরন্তু, ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের জেরে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই অঞ্চলে যেকোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে, কারণ বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এই অঞ্চলেই অবস্থিত। সৌদি আরব, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাদের উৎপাদন বা রপ্তানিতে যেকোনো বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধানে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করেছে।

জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে বিশ্বব্যাপী নজর বাড়লেও, মধ্যপ্রাচ্যের প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেলের মজুদ এখনও অনস্বীকার্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের গ্যাস ও তেল ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা এখনও ব্যাপক, বিশেষত যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। কাতার, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে, ইউরোপের জ্বালানি চাহিদা পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কাতার তাদের উত্তর ফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে LNG উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমান ৭.৭ কোটি টন থেকে ১২.৬ কোটি টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। এই বিনিয়োগ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করতে পারে, তবে তা নির্ভর করছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। অন্যদিকে, সৌদি আরব তাদের 'ভিশন ২০৩০' এর অংশ হিসেবে তেল নির্ভরতা কমানোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে, যেমন সৌর এবং বায়ু শক্তিতে, বিশাল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই ধরনের পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহায়ক হবে। তবে, স্বল্পমেয়াদে আঞ্চলিক সংঘাতগুলো এই বিনিয়োগগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।

বছর/ক্ষেত্র অপরিশোধিত তেল উৎপাদন (মিলিয়ন ব্যারেল/দিন) প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট) নবায়নযোগ্য শক্তি বিনিয়োগ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বৈশ্বিক LNG রপ্তানিতে অংশ (%)
২০২২ (মধ্যপ্রাচ্য) ২৫.৬ ২,৬০০ ৫০ ৪৫
২০২০ (মধ্যপ্রাচ্য) ২৪.২ ২,৪৫০ ৩০ ৪০
২০১৮ (মধ্যপ্রাচ্য) ২৩.৮ ২,৩০০ ১৫ ৩৫

উৎস: OPEC, BP Statistical Review of World Energy, IRENA, IEA

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তিগুলোর (যেমন সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত) সাথে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। বিশেষত, UN Peacekeeping মিশনের আওতায় বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যেতে পারে, যা জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরোক্ষভাবে সহায়ক হবে।
  • BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং সার্ক (সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মধ্যে জরুরি জ্বালানি মজুদের যৌথ ব্যবস্থা এবং বিকল্প সরবরাহ রুটের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা যেতে পারে, যা বৈশ্বিক সংকটের সময় জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে।
  • বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB) কে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানে সক্রিয় হতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি (যেমন সৌর ও বায়ু শক্তি) এবং পারমাণবিক শক্তির মতো অভ্যন্তরীণ উৎসের উন্নয়নে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০১০ (National Renewable Energy Policy 2010) এবং পারমাণবিক শক্তি আইন ২০১২ (Nuclear Energy Act 2012) এর অধীনে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো অপরিহার্য।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator