কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: কর্পোরেট নেতৃত্বের নতুন চ্যালেঞ্জ ও এইচআর-এর ভূমিকা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: কর্পোরেট নেতৃত্বের নতুন চ্যালেঞ্জ ও এইচআর-এর ভূমিকা

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: কর্পোরেট নেতৃত্বের নতুন চ্যালেঞ্জ ও এইচআর-এর ভূমিকা
কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: কর্পোরেট নেতৃত্বের নতুন চ্যালেঞ্জ ও এইচআর-এর ভূমিকা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, দেশের শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার ফার্ম ‘প্রযুক্তি দিগন্ত’ তাদের বার্ষিক কর্মপরিবেশ সমীক্ষায় এক উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। দেখা গেছে, তাদের ৩৫% কর্মী ...

সম্প্রতি, দেশের শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার ফার্ম ‘প্রযুক্তি দিগন্ত’ তাদের বার্ষিক কর্মপরিবেশ সমীক্ষায় এক উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। দেখা গেছে, তাদের ৩৫% কর্মী উচ্চ মাত্রার মানসিক চাপ এবং উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন, যা গত তিন বছরে প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কাজের অতিরিক্ত চাপ, কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতির অভাব। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র নয়; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এর এক সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে কর্মরত পেশাজীবীদের মধ্যে প্রায় ২৭% কর্মপরিবেশজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন আর কেবল একটি মানবিক বিষয় নয়, বরং কর্পোরেট নেতৃত্বের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ এবং এইচআর বিভাগের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথাগত এইচআর পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবনী সমাধান ও নীতি প্রণয়ন আবশ্যক হয়ে পড়েছে, যা শুধুমাত্র কর্মীদের সুস্থ রাখবে না, বরং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করবে।

কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর্পোরেট নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সাধন করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার উৎপাদনশীলতা হারানো যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দ্রুত শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে কর্মীদের উপর কাজের চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরি পোশাক এবং আর্থিক সেবার মতো দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোতে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, একটি বহুজাতিক ব্যাংক সম্প্রতি তাদের কর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ কমাতে কাউন্সেলিং সেশন চালু করলেও, অধিকাংশ কর্মী কর্মক্ষেত্রের নেতিবাচক প্রভাবের ভয়ে প্রকাশ্যে সহায়তা চাইতে দ্বিধা বোধ করেন। এই দ্বিধার মূল কারণ হলো কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা এবং এর ফলে কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা। এইচআর বিভাগের জন্য এই পরিস্থিতি একটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে: একদিকে কর্মীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে এমন একটি সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি করা যেখানে কর্মীরা নির্ভয়ে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে পারেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন নেতৃত্ব পর্যায় থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অনুধাবন এবং এর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট ও রিসোর্স বরাদ্দ করা।

কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এইচআর বিভাগের ভূমিকা বর্তমানে শুধু নিয়োগ, প্রশিক্ষণ বা বেতন-ভাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি সামগ্রিক কল্যাণমূলক পদ্ধতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে, বাংলাদেশের ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের সামগ্রিক সুস্থতার উপর জোর দিতে শুরু করেছে। যদিও তাদের মূল ফোকাস দক্ষতা উন্নয়ন, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যকে কর্মীর সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। এইচআর বিভাগকে অবশ্যই কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি চিহ্নিত করতে এবং সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে সক্ষম হতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, গোপনীয় কাউন্সেলিং পরিষেবা প্রদান, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ আয়োজন এবং নমনীয় কর্মঘণ্টা বা রিমোট কাজের সুযোগ তৈরি করা। অনেক ক্ষেত্রে, কর্মীরা তাদের মানসিক সমস্যার জন্য যথাযথ চিকিৎসা বা সহায়তা পান না কারণ তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য বা সংস্থান নেই। এইচআর বিভাগ এই তথ্য ও সংস্থান সরবরাহকারী মূল সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। এমনকি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সদস্যভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে, এই উদ্যোগগুলোকে আরও ব্যাপক ও কাঠামোগত করার জন্য একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠান/বিভাগ প্রস্তাবিত/গৃহীত পদক্ষেপ বছর লক্ষ্য/প্রভাব
UGC (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য নির্দেশিকা জারি ২০২১ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও সহায়তা প্রদান
NSDA (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) দক্ষতা উন্নয়নে মানসিক সুস্থতা বিষয়ক মডিউল অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ ২০২২ দক্ষ কর্মীদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি
BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ডেটা সংগ্রহে উদ্যোগ ২০২৩ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সঠিক চিত্র লাভ
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কারিগরি প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং পরিষেবা চালুর প্রস্তাব ২০২৪ শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থানের পূর্বে মানসিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ
SEIP (Skills for Employment Investment Program) বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট সেশন অন্তর্ভুক্তি ২০২০-২০২৪ প্রশিক্ষণার্থীদের কর্মজীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করা

উৎস: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন ও পাবলিক ডকুমেন্টস থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে 'দ্য মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮' এর ধারা ১৯ অনুযায়ী প্রতিটি কর্মীর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং এইচআর বিভাগকে এই আইন বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে, যার মধ্যে কর্মীদের জন্য সাইকো-সামাজিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) কর্তৃক পরিচালিত সকল দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় একটি বাধ্যতামূলক মডিউল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা কর্মীদের কর্মজীবনের শুরু থেকেই মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করবে।
  • বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) তাদের 'মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট গাইডলাইনস' (২০২১) এর আলোকে কর্পোরেট সেক্টরের জন্য একটি 'কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা' প্রণয়ন করবে, যেখানে কর্মপরিবেশে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মানদণ্ড, এইচআর বিভাগের দায়িত্ব এবং নিয়মিত পরিদর্শনের জন্য একটি কাঠামো থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator