কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতার সংকট ও নীরব বিদ্রোহ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতার সংকট ও নীরব বিদ্রোহ

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতার সংকট ও নীরব বিদ্রোহ
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতার সংকট ও নীরব বিদ্রোহ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রাথমিক সমীক্ষার তথ্য উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা গেছে দেশের কর্মজীব...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রাথমিক সমীক্ষার তথ্য উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা গেছে দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০% কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক চাপে ভুগছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫% গুরুতর পর্যায়ে। এই তথ্য কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের একটি নীরব সংকেত, যা উৎপাদনশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বিদ্রোহের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে কাজের ধরন, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং ডিজিটাল সংযুক্তি বৃদ্ধির কারণে এই চাপ আরও প্রকট হয়েছে।

এই মানসিক চাপ কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর তথ্য অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বছরে কর্মঘণ্টা হারানোর পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, বার্নআউট সিনড্রোম এবং ঘুমের ব্যাঘাতের মতো সমস্যাগুলো এখন কর্মক্ষেত্রের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মজীবীরা প্রায়শই এই সমস্যাগুলো গোপন রাখেন সামাজিক হেয় প্রতিপত্তির ভয়ে, যা তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থার আরও অবনতি ঘটায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বাধা দেয়। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (IEDCR) এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে বেশি, যা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিসাধন করছে এবং কর্মপরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট এবং অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ড্রাগের বিক্রি প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কর্মজীবীদের মধ্যে মানসিক চাপ মোকাবেলায় ঔষধনির্ভরতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই ঔষধনির্ভরতা সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে প্রায়শই উপসর্গ দমন করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ মোকাবেলায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, যেমন – মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক নিয়োগ, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ এবং কাজের পরিবেশের উন্নতি সাধনে বিনিয়োগের অভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর ফলস্বরূপ, কর্মীদের মধ্যে কাজের প্রতি অনীহা, উদ্ভাবনী ক্ষমতার হ্রাস এবং সর্বোপরি কর্মস্থল ত্যাগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কর্মীদের উৎপাদনশীলতা হ্রাসের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

বছর কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা (শতাংশ) মানসিক স্বাস্থ্য সেবার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি (শতাংশ) কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি (শতাংশ) অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট বিক্রি বৃদ্ধি (শতাংশ)
২০১৮ ১৪.৫% ৫.২% ৪.৩% ৭.৮%
২০১৯ ১৫.৮% ৬.১% ৫.১% ৯.২%
২০২০ ১৮.২% ৯.৩% ৭.৫% ১৩.৪%
২০২১ ১৯.৫% ১২.০% ৮.৮% ১৫.১%
২০২২ ২০.৩% ১৩.৫% ৯.৫% ১৬.৩%

উৎস: MOHFW, DGHS, DGDA এবং NIMH-এর সম্মিলিত বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর অধীনে একটি জাতীয় কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করা, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ, কাউন্সিলিং পরিষেবা এবং একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। এই নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ এর আলোকে কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ধারাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা পরিচালনা করা এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। প্রাপ্ত তথ্য DGDA এর সাথে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে, যাতে মানসিক স্বাস্থ্যের ঔষধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং অহেতুক ঔষধনির্ভরতা কমানো যায়।
  • প্রতিটি কর্মপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচির (Employee Assistance Program - EAP) বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন করা, যেখানে IEDCR এর সুপারিশকৃত প্রোটোকল অনুসরণ করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দ্বারা নিয়মিত চেক-আপ এবং কাউন্সেলিং পরিষেবা প্রদান করা হবে। এই কর্মসূচিতে কর্মঘণ্টা, কাজের চাপ এবং কর্মপরিবেশের উন্নতি সাধনের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator