প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে সম্পদ: অপচয়ের বৃত্ত ভেঙে সম্ভাবনার অর্থনীতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে সম্পদ: অপচয়ের বৃত্ত ভেঙে সম্ভাবনার অর্থনীতি

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে সম্পদ: অপচয়ের বৃত্ত ভেঙে সম্ভাবনার অর্থনীতি
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে সম্পদ: অপচয়ের বৃত্ত ভেঙে সম্ভাবনার অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪' এর খসড়া দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকা...

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪' এর খসড়া দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নীতিমালায় প্লাস্টিকের উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত একটি সমন্বিত পদ্ধতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের দীর্ঘদিনের অপচয়মুখী অর্থনীতিকে একটি সম্ভাবনাময় বৃত্তাকার অর্থনীতির দিকে ধাবিত করার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট বর্জ্য সমস্যা এবং এর পরিবেশগত প্রভাব এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। এই নীতিমালা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি কেবল পরিবেশ দূষণ কমাতেই সাহায্য করবে না, বরং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে প্লাস্টিককে 'বর্জ্য' থেকে 'সম্পদে' রূপান্তরিত করার পথ সুগম করবে।

বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে প্লাস্টিকের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা একদিকে উৎপাদনশীলতা ও খাদ্য সংরক্ষণ বৃদ্ধি করলেও অন্যদিকে পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর তথ্য অনুযায়ী, পলিমালচিং, গ্রিনহাউস কভার, সেচ পাইপ এবং খাদ্য প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে মাটি ও পানিতে মিশে যাচ্ছে, যা মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত পলিথিনের একটি বড় অংশ ফসল তোলার পর মাঠে ফেলে রাখা হয়, যা পরবর্তী ফসলের উৎপাদন ব্যাহত করে। এই পরিস্থিতিতে, সার্কুলার অর্থনীতির ধারণা প্রয়োগ করে ব্যবহৃত প্লাস্টিককে পুনরায় কৃষি উপকরণ বা অন্যান্য পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে, যা একদিকে কাঁচামালের চাহিদা কমাবে এবং অন্যদিকে পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস করবে।

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র পুনর্ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিককে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে টেকসই নির্মাণ সামগ্রী বা কৃষি উপকরণ তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যকে ইট, টাইলস বা এমনকি কিছু কৃষি যন্ত্রাংশের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা প্রচলিত উপকরণের উপর নির্ভরতা কমাবে। এছাড়া, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জৈব সার বা বায়োচার তৈরিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং এর সঠিক নিষ্পত্তির উপর গবেষণা পরিচালনা করছে, যা কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবেশগত পদচিহ্ন কমাতে সহায়ক হবে। এই ধরনের উদ্যোগগুলো কেবল বর্জ্য কমাতেই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সুযোগ তৈরি করবে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি (২০২২-২৩) পরিমাণ (টন) শতাংশ (%)
মোট উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য ৮,০০,০০০ ১০০%
সংগৃহীত প্লাস্টিক বর্জ্য ৬,০০,০০০ ৭৫%
পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য ৪,৫০,০০০ ৫৬.২৫%
পুনর্ব্যবহার করা হয়নি (পরিবেশে মিশেছে) ৩,৫০,০০০ ৪৩.৭৫%
কৃষি ও খাদ্য প্যাকেজিং থেকে উৎপাদিত বর্জ্যের আনুমানিক অংশ ১,৬০,০০০ ২০%

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪ (খসড়া) এবং DAE-এর পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অনুমানিক হিসাব।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'বাংলাদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪' এর দ্রুত চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • DAE এবং BARI-কে সমন্বয় করে কৃষকদের মধ্যে বায়োডিগ্রেডেবল পলিমালচিং এবং অন্যান্য টেকসই কৃষি উপকরণের ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকি প্রদান করতে হবে, যাতে প্রচলিত প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন কমে আসে।
  • BARC-কে নেতৃত্বে নিয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য পণ্য (যেমন - নির্মাণ সামগ্রী, সার মেশানোর উপাদান) তৈরির গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে এবং এই ধরনের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে শিল্পায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator