অচেনা পথের পথিক: মেধা স্বত্ব আইন ও বাংলাদেশের স্টার্টআপের উদ্ভাবনী সুরক্ষা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অচেনা পথের পথিক: মেধা স্বত্ব আইন ও বাংলাদেশের স্টার্টআপের উদ্ভাবনী সুরক্ষা

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
অচেনা পথের পথিক: মেধা স্বত্ব আইন ও বাংলাদেশের স্টার্টআপের উদ্ভাবনী সুরক্ষা
অচেনা পথের পথিক: মেধা স্বত্ব আইন ও বাংলাদেশের স্টার্টআপের উদ্ভাবনী সুরক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালের বিশ্ব মেধা স্বত্ব সূচকে (Global Intellectual Property Index) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩২টি দেশের মধ্যে ১০২তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ...

২০২২ সালের বিশ্ব মেধা স্বত্ব সূচকে (Global Intellectual Property Index) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩২টি দেশের মধ্যে ১০২তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত (৪২তম) ও পাকিস্তানের (৬০তম) চেয়েও পিছিয়ে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং বাংলাদেশের উদীয়মান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য মেধা স্বত্ব (Intellectual Property - IP) সুরক্ষায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর'কে (DPDT) 'শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়' থেকে 'আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়'-এর অধীনে আনার প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে, যা মেধা স্বত্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংহত করার একটি ইঙ্গিত। এই আলোচনাটি দেশের উদ্ভাবনী অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে মেধা স্বত্ব আইন কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেই প্রশ্নটি সামনে এনেছে।

বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো, বিশেষ করে প্রযুক্তি-নির্ভর ও উদ্ভাবনী খাতে যারা কাজ করছে, তারা প্রায়শই তাদের সৃজনশীল পণ্য, প্রক্রিয়া বা সেবার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার সম্মুখীন হয়। যদিও কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫), পেটেন্ট আইন ২০২২ এবং ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯ এর মতো আইনগুলো বিদ্যমান, তবে এগুলোর প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাবে উদ্ভাবকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সফটওয়্যার স্টার্টআপের জন্য তার সোর্স কোড বা অ্যালগরিদমকে পেটেন্ট করা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে প্রায়শই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও স্থানীয় আইনগত বাধ্যবাধকতাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। এই সীমাবদ্ধতাগুলো যখন একটি স্টার্টআপ তার উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে চায় বা বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চায়, তখন তা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় দুর্বলতা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সরাসরি উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

স্টার্টআপগুলোর জন্য মেধা স্বত্ব সুরক্ষা শুধু উদ্ভাবনের কপি হওয়া থেকে বাঁচায় না, বরং এটি তাদের বাজার মূল্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে মেধা স্বত্ব নিবন্ধনের প্রক্রিয়া এখনও ডিজিটালকরণে পিছিয়ে আছে, যা আবেদনকারীদের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কার্যকর মেধা স্বত্ব ব্যবস্থার অভাবে অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোগ (SMEs) তাদের উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে তাদের বাণিজ্যিকীকরণের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। এছাড়া, মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়াও অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেক স্টার্টআপ আইনি পদক্ষেপ নিতে নিরুৎসাহিত হয়। এর ফলস্বরূপ, উদ্ভাবকরা তাদের মেধা খাটিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের উদ্ভাবনী সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশ সরকার, ২০৪১ সালের মধ্যে একটি জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতি (knowledge-based economy) গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে মেধা স্বত্ব সুরক্ষার এই দুর্বলতাগুলো দূর করা অপরিহার্য।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
বিশ্ব মেধা স্বত্ব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান (মোট দেশের মধ্যে) ১১৮তম (১২৯) ১২১তম (১২৯) ১২২তম (১৩১) ১২২তম (১৩২) ১০২তম (১৩২)
পেটেন্ট আবেদনের সংখ্যা (বাংলাদেশ) ৩৫১ ৪১০ ৪৫০ ৫১০ ৫৫৫
ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের সংখ্যা (বাংলাদেশ) ৬,৫০০ ৭,২০০ ৭,৮০০ ৮,৫০০ ৯,২০০
কপিরাইট নিবন্ধনের সংখ্যা (বাংলাদেশ) ৫০০ ৫৫০ ৬০০ ৬৫০ ৭০০

উৎস: Global Intellectual Property Index, WIPO IP Statistics Data Center, DPDT বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT) কে অবিলম্বে 'আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়'-এর অধীনে এনে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মেধা স্বত্ব সংস্থা (Intellectual Property Office) হিসেবে পুনর্গঠন করা হোক, যা মেধা স্বত্ব আইনসমূহ (যেমন: পেটেন্ট আইন ২০২২, ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯, কপিরাইট আইন ২০০০) প্রয়োগ ও নিবন্ধনে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন ও দক্ষতা নিশ্চিত করবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি সমন্বিত মেধা স্বত্ব নিবন্ধন ও পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হোক, যা ডিজিটাল পদ্ধতিতে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক এবং কপিরাইট আবেদন গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং লঙ্ঘনের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবে, এবং এই প্ল্যাটফর্মে World Bank ও ADB-এর প্রযুক্তিগত সহায়তাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেধা স্বত্ব আইন ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য 'পেটেন্ট আইন ২০২২' ও 'কপিরাইট আইন ২০০০'-এর আওতায় বিশেষ কর্মশালা ও আইনি সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হোক, যা উদ্ভাবকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে এবং সুরক্ষায় উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator