শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি: পর্ষদ স্বাধীনতায় ফাঁকি ও সুশাসনের প্রশ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি: পর্ষদ স্বাধীনতায় ফাঁকি ও সুশাসনের প্রশ্ন

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি: পর্ষদ স্বাধীনতায় ফাঁকি ও সুশাসনের প্রশ্ন
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি: পর্ষদ স্বাধীনতায় ফাঁকি ও সুশাসনের প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা ও তাদের স্বাধীনতা নিশ্চ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা ও তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে জারি করা কঠোর নির্দেশনা এবং একই সাথে কিছু কোম্পানির পক্ষ থেকে এই নির্দেশনার প্রতি অনীহা, শেয়ারবাজারের সুশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। বিশেষ করে, গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি কোম্পানির অনিয়ম তদন্তে দেখা গেছে যে, পর্ষদে তথাকথিত স্বাধীন পরিচালকদের নিষ্ক্রিয়তা বা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অন্যতম কারণ। একটি সাম্প্রতিক বিএসইসি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৩০% তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।

শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার অন্যতম স্তম্ভ হলো স্বাধীন পরিচালক। তাদের মূল কাজ হলো ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং বিশেষ করে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য বা উদ্যোক্তাদের পছন্দের ব্যক্তিরাই স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন, যাদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন থেকে যায়। এতে করে তারা পর্ষদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, যেমন – অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণে সম্পর্কিত পক্ষ (related party) এর সাথে লেনদেন, সম্পদ হস্তান্তর বা অলাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন। World Bank-এর 'Ease of Doing Business' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করতে হলে করপোরেট গভর্ন্যান্সে এই দুর্বলতা দূর করা অপরিহার্য, কারণ এটি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

পর্ষদের স্বাধীনতায় এই ফাঁকি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকেই উৎসাহিত করে না, বরং এটি সামগ্রিকভাবে শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। যখন পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয় না এবং স্বাধীন পরিচালকরা তাদের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হন, তখন কোম্পানির অভ্যন্তরে 'টানেলিং' বা সম্পদ পাচারের মতো ঘটনা ঘটে। এর ফলে কোম্পানির মুনাফা কমে যায়, শেয়ারের মূল্য প্রভাবিত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ADB (Asian Development Bank) এর একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্সের কারণে গড়ে প্রতি বছর জিডিপির ১-২% ক্ষতি হয়, যার একটি বড় অংশ আসে শেয়ারবাজার থেকে। বাংলাদেশ সরকার 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার অপরিহার্য। এর জন্য কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং বিএসইসি'র করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ এর কার্যকর প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বিএসইসি কর্তৃক স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড আরোপ, তাদের পারিশ্রমিক ও দায়িত্বের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন পরিচালকদের পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যদের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমনকি, তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে, যাতে তারা প্রকৃত অর্থেই কোম্পানির স্বার্থ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষা করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন – অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিএসইসি-কে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও ক্ষমতা প্রদান করে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করতে পারে।

বছর পর্যবেক্ষিত কোম্পানি সংখ্যা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকের কার্যকারিতা রেটিং (১-৫) সংশ্লিষ্ট পক্ষ লেনদেনের (Related Party Transactions) গড় শতাংশ (কোম্পানির মোট টার্নওভারের)
২০২০ ২৫০ ২.৮ ১২.৫%
২০২১ ২৭৫ ২.৬ ১৪.৮%
২০২২ ৩০০ ২.৪ ১৬.২%
২০২৩ ৩২৫ ২.৩ ১৮.১%

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও World Bank Governance Indicators

সুপারিশ

  • স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে যোগ্য পেশাদাররা আবেদন করবেন এবং শেয়ারহোল্ডাররা তাদের মধ্য থেকে নির্বাচন করবেন, যেমনটি ভারত ও সিঙ্গাপুরে কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান।
  • কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এর ধারা ৯৬(১) সংশোধন করে স্বাধীন পরিচালকদের জন্য পর্ষদে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক সভার উপস্থিতি এবং পর্ষদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর ওপর তাদের লিখিত ভিন্নমত (dissenting opinion) প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, যা তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন: অর্থ মন্ত্রণালয়) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর 'সংশ্লিষ্ট পক্ষ লেনদেন (Related Party Transactions)' নিরীক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করবে, যা বিএসইসি'র করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ এর ধারা ১(৫)(ঝ) এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator