লোহিত সাগরের টানাপোড়েন: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন মেরুকরণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

লোহিত সাগরের টানাপোড়েন: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন মেরুকরণ

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
লোহিত সাগরের টানাপোড়েন: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন মেরুকরণ
লোহিত সাগরের টানাপোড়েন: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন মেরুকরণ
ছবি: সংগৃহীত
গত ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা পরিচালিত লোহিত সাগরে একটি তেলের ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন...

গত ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা পরিচালিত লোহিত সাগরে একটি তেলের ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই হামলা শুধু পণ্য পরিবহনের রুটকেই ঝুঁকিপূর্ণ করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বিদ্যমান টানাপোড়েনকে আরও প্রকট করে তুলেছে, যা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এই জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভবিষ্যৎ মূল্য প্রবণতাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।

লোহিত সাগরের এই অস্থিরতা মূলত ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হুথি বিদ্রোহীদের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ফল। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১২% এবং বিশ্ব তেলের প্রায় ৮% পরিবাহিত হয়। হামলার কারণে বিশ্বের প্রধান শিপিং কোম্পানিগুলো, যেমন মার্স্ক (Maersk) এবং হাapag-লয়েড (Hapag-Lloyd), লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ (Cape of Good Hope) হয়ে দীর্ঘতর ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই দীর্ঘ পথ অতিরিক্ত ১০-১৫ দিন সময় নেয় এবং জ্বালানি খরচ প্রায় ৩০-৪০% বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অবদান রাখছে। বিশেষত এশিয়া থেকে ইউরোপ এবং ইউরোপ থেকে এশিয়ায় জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) জানিয়েছে, এই রুট পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও, কৌশলগত তেল মজুদ (Strategic Petroleum Reserves) এবং অন্যান্য রুট ব্যবহারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

এই সংকটকালে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো লোহিত সাগরে নৌ-সুরক্ষা জোরদার করতে 'অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান' (Operation Prosperity Guardian) গঠন করেছে, যার লক্ষ্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা প্রদান করা। অন্যদিকে, ইরান হুথি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক, তাদের নিজস্ব জ্বালানি রপ্তানি রুটগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা বিকল্প রুট যেমন আরব উপদ্বীপের পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত পাইপলাইন ব্যবহারের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখছে, যা পারস্য উপসাগর থেকে সরাসরি আরব সাগরে তেল পরিবহন করতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ রুটগুলোর বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে এবং প্রচলিত সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের উপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র শুধুমাত্র জ্বালানি তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে, কারণ কাতার এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ইউরোপে LNG সরবরাহের প্রধান পথও এই লোহিত সাগর।

জ্বালানি পণ্য লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের শতকরা হার (২০২৩) কেপ অফ গুড হোপ হয়ে রুট পরিবর্তনের কারণে গড় অতিরিক্ত সময় (দিন) কেপ অফ গুড হোপ হয়ে রুট পরিবর্তনের কারণে গড় অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ (%)
অপরিশোধিত তেল ৮% ১০-১৪ ৩০-৪০%
শোধিত তেল ১২% ১০-১৫ ৩৫-৪৫%
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ১০% ১২-১৬ ৪০-৫০%
অন্যান্য পণ্য ১২% ১৫-২০ ২৫-৩৫%

উৎস: রয়টার্স, ব্রেমার শিপিং অ্যানালাইসিস, এবং আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লোহিত সাগরের চলমান সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) এবং UN Peacekeeping মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে জোরালো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক থাকে।
  • BIMSTEC এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি আঞ্চলিক সংলাপ ও সহযোগিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যেখানে সদস্য দেশগুলো জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ রুট এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে।
  • সরকারকে ২০২৫ সালের মধ্যে একটি 'জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ রুট বহুমুখীকরণ আইন' প্রণয়ন করতে হবে, যা দেশের জ্বালানি আমদানির জন্য শুধুমাত্র সামুদ্রিক রুটের উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলভিত্তিক পাইপলাইন, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগ এবং এলএনজি টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও বিনিয়োগের রূপরেখা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator