কর্মচারী ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ: 'গ্রেট রেজিগনেশন' পরবর্তী যুগে এইচআর-এর নতুন কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মচারী ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ: 'গ্রেট রেজিগনেশন' পরবর্তী যুগে এইচআর-এর নতুন কৌশল

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
কর্মচারী ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ: 'গ্রেট রেজিগনেশন' পরবর্তী যুগে এইচআর-এর নতুন কৌশল
কর্মচারী ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ: 'গ্রেট রেজিগনেশন' পরবর্তী যুগে এইচআর-এর নতুন কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা এবং স্ব...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা এবং স্বল্পমেয়াদী কর্মজীবনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা 'গ্রেট রেজিগনেশন'-এর বৈশ্বিক ঢেউয়ের একটি স্থানীয় প্রতিচ্ছবি। এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কর্মজীবনের প্রথম পাঁচ বছরে প্রায় ৩০% গ্র্যাজুয়েট তাদের প্রথম কর্মস্থল পরিবর্তন করছেন, যেখানে উন্নত কর্মপরিবেশ, ক্যারিয়ার পাথ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগের অভাব প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই প্রবণতা কেবল বেসরকারি খাত নয়, বরং সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রভাবিত করছে, যেখানে মেধাবী কর্মীদের ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে পরিবর্তিত কর্মপরিবেশে কর্মীদের প্রত্যাশা বৃদ্ধি পাওয়ায়, ঐতিহ্যবাহী এইচআর কৌশলগুলো অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।

এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, এইচআর বিভাগগুলোকে এখন কর্মীদের ধরে রাখার জন্য আরও উদ্ভাবনী ও সংবেদনশীল কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। কর্মীরা এখন কেবল উচ্চ বেতন নয়, বরং অর্থপূর্ণ কাজ, কর্ম-জীবনের ভারসাম্য, এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ খুঁজছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে তরুণ কর্মশক্তির একটি বিশাল অংশ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, সেখানে তাদের দক্ষতা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে তারা দ্রুত কর্মস্থল পরিবর্তন করছে। উদাহরণস্বরূপ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং ফিনটেক শিল্পে কর্মীদের ধরে রাখার হার তুলনামূলকভাবে কম, কারণ এসব খাতে কর্মীদের কাছে আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা এবং দ্রুত ক্যারিয়ার অগ্রগতির প্রত্যাশা থাকে। বিদ্যমান শ্রম আইন, যেমন বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮), যদিও কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা করে, কিন্তু পরিবর্তিত কর্মপরিবেশে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য, নমনীয় কাজের সময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে আরও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন কর্মীদের সামগ্রিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে, যার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম এবং কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এই নতুন যুগে, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মজীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানও এইচআর-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদিও জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, কিন্তু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ দক্ষতা উন্নয়নের চাহিদা পূরণে তাদের ভূমিকা আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন। কর্মীরা যখন দেখেন যে তাদের প্রতিষ্ঠান তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করছে, তখন তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি অনুগত থাকেন। বিশেষ করে, SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মতো প্রকল্পগুলো যদি বেসরকারি খাতের সাথে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করে, তবে কর্মীদের জন্য আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং-এর সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ গ্র্যাজুয়েট কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেরই শিল্প-ভিত্তিক দক্ষতার অভাব রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে এইচআর বিভাগগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে UGC (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) এর সাথে সমন্বয় করে এমন পাঠ্যক্রম প্রণয়নে সহায়তা করতে হবে যা বাজারের চাহিদা পূরণ করে এবং কর্মীদের কর্মজীবনে প্রবেশের পর দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। ফলস্বরূপ, কর্মীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হন এবং কর্মস্থল পরিবর্তনের প্রবণতা কমে আসে।

বছর কর্মস্থল পরিবর্তনকারী গ্র্যাজুয়েট (%) (প্রথম ৫ বছর) দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী (%) (কর্পোরেট) কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রাপ্তি (%) (কর্পোরেট)
২০১৯ ২২% ৪০% ১৫%
২০২০ ২৫% ৩৫% ২০%
২০২১ ৩০% ৪৫% ২৫%
২০২২ ২৮% ৫০% ৩০%
২০২৩ ২৭% ৫৫% ৩৫%

উৎস: BIDS গবেষণা (২০২১-২০২৩ সালের গড়), কর্পোরেট এইচআর জরিপ (২০২৩), SEIP বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২-২৩)

সুপারিশ

  • কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর অধীনে 'কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিধি' সংক্রান্ত ধারাগুলোর আধুনিকীকরণ করে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • UGC এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর সাথে সমন্বয় করে NSDA-কে একটি জাতীয় কর্মশালা আয়োজন করতে হবে, যেখানে শিল্প-ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের (reskilling ও upskilling) জন্য কর্পোরেট চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পাঠ্যক্রমের মধ্যে ব্যবধান চিহ্নিত করে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা (Joint Action Plan) তৈরি করা হবে, যা SEIP প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।
  • BANBEIS এর ডেটা ব্যবহার করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের এইচআর বিভাগকে কর্মীদের কর্মজীবনের প্রথম তিন বছরে একটি সুনির্দিষ্ট 'ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট পাথ' (Career Development Path) তৈরি করে দিতে হবে, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম এবং দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে কর্মীদের মধ্যে পেশাগত স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বোধ তৈরি হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator