মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে প্রত্যাবাসিত ৩০১ জন মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশীর করুণ দশা আবারও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। গত মে মাসে পররাষ্ট্...

সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে প্রত্যাবাসিত ৩০১ জন মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশীর করুণ দশা আবারও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। গত মে মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) ও ব্র্যাকের সহায়তায় এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও, দেশে ফেরার পর তাদের পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে সমন্বিত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান। ভুক্তভোগীদের অনেকেই পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভয় পাচ্ছেন বা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না, যা মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) এর মূল উদ্দেশ্যকেই চ্যালেঞ্জ করছে।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা, বিশেষ করে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা ২০১৫, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, প্রত্যাবাসন এবং পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান রেখেছে। আইনটির ধারা ১৪ (১) অনুযায়ী, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যার মধ্যে রয়েছে আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা এবং আইনি সহায়তা। তবে, বাস্তবে দেখা যায়, প্রত্যাবাসিতদের জন্য গঠিত ট্রাস্ট ফান্ড বা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সহায়তা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি বড় বাধা। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে ভুক্তভোগীরা প্রায়শই প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের পুনরায় পাচারচক্রের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। World Bank-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মানব পাচার থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তদের জন্য টেকসই পুনর্বাসন কর্মসূচির অভাব তাদের সমাজে পুনঃএকত্রীকরণে বড় বাধা সৃষ্টি করছে, যেখানে বাংলাদেশের চিত্রও ব্যতিক্রম নয়।

প্রত্যাবাসিতদের জন্য কেবল আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়; তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং সমাজে পুনঃএকত্রীকরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অপরিহার্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'Reducing Vulnerability to Human Trafficking' শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছে যে, প্রত্যাবাসিতদের মধ্যে যারা দ্রুত কোনো আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারে না, তাদের পাচারকারীদের দ্বারা পুনরায় টার্গেট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মানব পাচার প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-২০২২) এবং এর ধারাবাহিকতায় নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রণীত হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। বিশেষ করে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই কমিটিগুলোর নিয়মিত সভা এবং ভুক্তভোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার অভাব প্রায়শই দেখা যায়। ফলস্বরূপ, প্রত্যাবাসিতদের অনেকেই সামাজিক বঞ্চনা, মানসিক ট্রমা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে আরও ক্ষুণ্ন করে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দায়েরকৃত মামলা ৫৪০ ৬১০ ৭২০ ৭৫০
প্রত্যাবাসিত ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১,২০০ ১,৪৫০ ১,৭০০ ২,০০০
পুনর্বাসন সহায়তা প্রাপ্ত ভুক্তভোগীর সংখ্যা (শতাংশ) ১৫% ১৮% ২২% ২৫%
মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তিকৃত মামলার হার (শতাংশ) ৮% ১০% ১২% ১৪%

উৎস: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার এবং IOM প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) এর ধারা ১৪(১) এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা ২০১৫ এর বিধিমালা ৫(১) অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের প্রত্যাবাসনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে এককালীন আর্থিক সহায়তা এবং মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ প্রদানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • মানব পাচার ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রিতার শিকার না হন।
  • World Bank এবং ADB এর সহায়তায় গঠিত মানব পাচার প্রতিরোধে গঠিত তহবিলগুলোর সুষম ও দ্রুত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটিগুলোর নিয়মিত সভা ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য একটি শক্তিশালী জবাবদিহিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator