সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রগুলোতে মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক সুস্থতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে কর্মপরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হওয়ায় এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) অধীনস্থ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) পরিচালিত এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, প্রায় ২০% কর্মজীবী কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং স্ট্রেস-সংক্রান্ত ব্যাধি অন্যতম। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের কর্মক্ষেত্রের ভেতরের নীরব সংকটকে তুলে ধরে, যা কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাজের অত্যধিক চাপ, অস্পষ্ট কর্মপরিধি, সহকর্মীদের সাথে সম্পর্কগত জটিলতা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা এই সংকটের প্রধান অনুঘটক। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR) এর এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিরবচ্ছিন্ন কাজের সময় এবং ছুটির দিনেও কাজের চাপ অনুভব করার মতো বিষয়গুলো কর্মীদের মধ্যে ক্রনিক স্ট্রেসের জন্ম দিচ্ছে। এই স্ট্রেস কেবলমাত্র মানসিক অসুস্থতার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে না, বরং শারীরিক অসুস্থতা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং হজম সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। যখন একজন কর্মী দীর্ঘক্ষণ ধরে মানসিক চাপে থাকেন, তখন তার মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিকভাবে কর্মদক্ষতা হ্রাস পায়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা কমে আসে এবং কর্মীদের মধ্যে ঘন ঘন অনুপস্থিতি দেখা দেয়, যা অর্থনৈতিকভাবেও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার দায়বদ্ধতা এখন কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করলেও, মূল চ্যালেঞ্জ হলো মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলা। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে হেয় চোখে দেখা হয় এবং কর্মীরা সহায়তা চাইতে দ্বিধা বোধ করেন, পাছে তাদের কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই স্টিগমা দূর করা এবং একটি সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচী, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করে কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। একই সাথে, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই বিষয়ে সদিচ্ছা ও সমর্থন প্রকাশ না করলে এই ধরনের উদ্যোগগুলো ফলপ্রসূ হবে না। কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা হলে তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে উন্নত করবে না, বরং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মপরিবেশকে আরও ইতিবাচক ও উৎপাদনশীল করে তুলবে।
| সংস্থা/প্রতিষ্ঠান | সমীক্ষা/প্রতিবেদন | প্রাপ্ত তথ্য | বছর |
|---|---|---|---|
| জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) | কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা | ২০% কর্মজীবী কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। | ২০২১-২২ |
| স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) | কর্মক্ষেত্রে স্ট্রেস সংক্রান্ত অসুস্থতার রিপোর্ট | সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা পূর্বের তুলনায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। | ২০২৩ |
| আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR) | কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা গবেষণা | ৬০% কর্মজীবী কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ক্রনিক স্ট্রেসে ভুগছেন। | ২০২২ |
| বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) | মানসিক স্বাস্থ্য ঔষধের প্রাপ্যতা পর্যালোচনা | ১০% মানসিক স্বাস্থ্য ঔষধের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। | ২০২৩ |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR), বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সমীক্ষা।
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর যৌথ উদ্যোগে 'কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং সেবা এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR) এর সহায়তায় কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দেশব্যাপী প্রচার অভিযান শুরু করা হোক, যা কর্মীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনাকে উৎসাহিত করবে এবং স্টিগমা দূর করতে সাহায্য করবে।
- বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) নিশ্চিত করুক যেন মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ঔষধগুলি দেশের সকল অঞ্চলে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে, পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং সহজলভ্য মূল্যে পাওয়া যায়, যাতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা কর্মীরা দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা সহায়তা পেতে পারেন।