সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা
সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, যা মূলত আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুদ্রানীতিকে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নীতি সুদহার বৃদ্ধি, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহারকে প্রভাবিত করে। রেপো রেট এবং রিভার্স রেপো রেট বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে তারল্য কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হয় এবং আমদানি কমে আসে। এছাড়া, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও আমদানি নিরুৎসাহিত করার একটি কৌশল, কারণ এতে আমদানিকারকদের জন্য পণ্য কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। তবে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই এই পদক্ষেপগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বিশেষ করে যখন অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানি অপরিহার্য থাকে এবং এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আমদানি শুল্ক ও করের মাধ্যমে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আয়ে ভূমিকা রাখলেও, মুদ্রানীতির সরাসরি প্রভাব ভিন্ন মাত্রার।

মুদ্রানীতির এই কৌশলগুলো বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের ওপর পুরোপুরি ছেড়ে না দিয়ে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা অনেক সময় কালোবাজার তৈরি করে এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারকে উৎসাহিত করে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়ায়। এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (ইপিবি) রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করলেও, বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা হ্রাস বা প্রতিযোগিতার কারণে তা সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ এবং এলসি মার্জিন বাড়ানোর মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো মুদ্রানীতির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। তবে, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কঠোরতা আরোপ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

সাল/মাস মাসিক মূল্যস্ফীতি (সার্বিক) আমদানি ব্যয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার)
সেপ্টেম্বর ২০২২ ৯.১০% ৬.৮০ ৩৫.৯০
মার্চ ২০২৩ ৯.২৪% ৬.০৮ ৩১.২০
সেপ্টেম্বর ২০২৩ ৯.৬৩% ৫.৭৫ ২৭.৭৫

উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ ব্যাংক

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতি সুদহার নির্ধারণে আরও নমনীয় ও বাস্তবসম্মত হতে হবে, যাতে এটি কেবল আমদানি নিয়ন্ত্রণ নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকেও সমর্থন করে। একইসাথে, ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের চাহিদা ও যোগানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে, যা হুন্ডি ও কালোবাজারি প্রতিরোধে সহায়তা করবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তালিকা ও অগ্রাধিকার ভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা বজায় রেখে উৎপাদনশীল খাতের সরবরাহ শৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং এনবিআর-কে এই নীতি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে হবে।
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে রপ্তানি বহুমুখীকরণে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজ এবং নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে, যার মধ্যে প্রবাসীদের জন্য সহজ বিনিয়োগ সুবিধা এবং রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নীতি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator