সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' রিপোর্টে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.১% থেকে কমিয়ে ৫.৭% করা হয়েছে, যেখানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং চলমান প্রকল্পগুলোতে শর্তাধীন ঋণের প্রভাবকে একটি মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রিপোর্ট এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ তার মেগা প্রকল্পগুলির অর্থায়নে ক্রমবর্ধমানভাবে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও ঋণ প্রদানকারী দেশগুলির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই নির্ভরশীলতা প্রায়শই অদৃশ্য কিন্তু সুদূরপ্রসারী শর্তাবলীর জালে আবদ্ধ, যা প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে, চীনা এক্সিম ব্যাংক, জাপানের জাইকা (JICA) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রস্তাবনার সঙ্গে যুক্ত থাকে এমন সব শর্ত, যা আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক মনে হলেও, প্রায়শই ভূ-রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। উদাহরণস্বরূপ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ঋণ চুক্তি বা পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ঋণদাতা দেশ বা সংস্থার নিজস্ব ঠিকাদার, প্রযুক্তি ও উপকরণ ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যা স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পরিপন্থী হতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক ঋণ অপরিহার্য হলেও, এই ঋণের সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো প্রায়শই প্রকল্প ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ঋণদাতা দেশ বা সংস্থা তাদের নিজস্ব কোম্পানি, প্রযুক্তি এবং পরামর্শক নিয়োগের শর্ত জুড়ে দেয়, যার ফলে উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার মূল্য থেকে বিচ্যুত হয়ে উচ্চ মূল্যে পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে হয়। এর একটি বড় উদাহরণ হলো, সড়ক, রেলওয়ে ও বিদ্যুৎ খাতের বহু প্রকল্পে চীনা ও ভারতীয় ঋণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ঋণদাতা দেশের প্রতিষ্ঠানকেই ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়, এমনকি যদি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান একই কাজ কম খরচে ও সমমানের গুণগত মান বজায় রেখে করতে সক্ষম হয়। এটি শুধু প্রকল্পের খরচই বাড়ায় না, বরং স্থানীয় শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করে। উপরন্তু, অনেক সময় এই শর্তগুলো পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক সুরক্ষা মানদণ্ড এবং শ্রম অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের টেকসই উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই ধরনের শর্তাধীন ঋণের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থের উপর এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে ঋণচুক্তি আলোচনার সময় বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
এই শর্তাধীন ঋণের অদৃশ্য জাল শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচই বাড়ায় না, বরং দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও প্রভাব ফেলে। যখন একটি দেশ কোনো নির্দিষ্ট ঋণদাতার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই ঋণদাতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) প্রকল্পের আওতায় নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে একই ধরনের শর্ত দেখা গেছে, যা অনেক সময় ঋণগ্রহীতা দেশের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও, অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায়, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে চীনের প্রভাব বাড়ছে, যা ঐতিহ্যগত মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করছে। BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা সত্ত্বেও, দ্বিপাক্ষিক ঋণচুক্তিগুলো প্রায়শই আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিবর্তে একক দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করে। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ালেও, অভ্যন্তরীণভাবে শর্তাধীন ঋণের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা খাতেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ সম্পদের একটি বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যায়। এর ফলে, দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথ বাধাগ্রস্ত হয়, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও দর কষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করে।
| ঋণদাতা সংস্থা/দেশ | ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিশ্রুত ঋণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | প্রধান শর্তের ধরণ | প্রকল্পের উদাহরণ | প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি (আনুমানিক) |
|---|---|---|---|---|
| বিশ্বব্যাংক | ৩.৫ | নীতিগত সংস্কার, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা মানদণ্ড | ঢাকা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট | ৫-১০% |
| এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) | ২.৮ | সুশাসন, স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট খাতের উন্নয়ন | রেলওয়ে কানেক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট | ৭-১২% |
| জাপান (JICA) | ৪.২ | জাপানি প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহার, পরামর্শক নিয়োগ | ম্যাট্রো রেল লাইন-৬ | ১০-১৫% |
| চীন (এক্সিম ব্যাংক) | ৫.১ | চীনা ঠিকাদার ও উপকরণ ব্যবহার, কৌশলগত অবকাঠামো | কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ | ১৫-২০% |
| রাশিয়া (রোসাটম) | ১১.৩ | রাশিয়ান প্রযুক্তি, প্রকৌশলী ও জ্বালানি সরবরাহ | রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র | ২৫-৩০% |
উৎস: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD), বিশ্বব্যাংক, ADB, JICA, চীনা এক্সিম ব্যাংক, রোসাটম (বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদন ও প্রকল্প দলিল থেকে সংগৃহীত, আনুমানিক)।
সুপারিশ
- বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি সমন্বিত 'ঋণ দর কষাকষি নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ঋণচুক্তি আলোচনার সময় শর্তাধীন ঋণের ভূ-রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও পরিবেশগত প্রভাব বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে দেশের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই নীতিমালায় আন্তর্জাতিক চুক্তি আইন (Law of Treaties) এর ধারা অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় ও বৈষম্যমূলক শর্ত প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে একটি শক্তিশালী 'প্রকল্প ব্যয় নিরীক্ষণ কমিটি' গঠন করতে হবে, যা প্রতিটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে ঋণদাতা দেশের আরোপিত শর্তগুলোর কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত ব্যয় এবং স্থানীয় সক্ষমতা বিকাশে এর প্রভাব বিশদভাবে পর্যালোচনা করবে। এই কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে, যারা প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা ও দেশীয় মূল্য সংযোজনের উপর নজরদারি করবে।
- আইন মন্ত্রণালয়কে একটি 'শর্তাধীন ঋণ বিরোধ নিষ্পত্তি ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক ঋণচুক্তিগুলোতে অন্তর্ভুক্ত শর্তাবলী লঙ্ঘিত হলে বা অস্পষ্টতা দেখা দিলে তার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান করতে সক্ষম হবে। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন এবং সালিসি প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত হবে, যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা করে চুক্তিভিত্তিক বিরোধগুলো নিষ্পত্তি করা যায়।