ডিজিটাল জলদস্যুতার করাল গ্রাস: মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সাইবার আইনের দুর্বলতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল জলদস্যুতার করাল গ্রাস: মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সাইবার আইনের দুর্বলতা

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
ডিজিটাল জলদস্যুতার করাল গ্রাস: মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সাইবার আইনের দুর্বলতা
ডিজিটাল জলদস্যুতার করাল গ্রাস: মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সাইবার আইনের দুর্বলতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে প্রকাশিত বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে অনলাইনে অবৈধভাবে অডিও-ভিডিও কনটেন্ট ও ই-বুক প্রকাশের হা...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে প্রকাশিত বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে অনলাইনে অবৈধভাবে অডিও-ভিডিও কনটেন্ট ও ই-বুক প্রকাশের হার প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সৃজনশীল অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এই ভয়াবহ চিত্র কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ডিজিটাল জলদস্যুতার করাল গ্রাসের এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে মেধাস্বত্বের অধিকারীরা প্রতিনিয়ত তাদের শ্রম ও বিনিয়োগের ফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে, যখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, তখন সাইবার পরিসরে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার এই দুর্বলতা দেশের উদ্ভাবনী সংস্কৃতি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কারণ হচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ করতে পারে।

এই ডিজিটাল জলদস্যুতার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিদ্যমান সাইবার আইন এবং মেধাস্বত্ব আইনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও প্রয়োগের দুর্বলতা। যদিও বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছিল, তবে এর আওতা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের মতো সুনির্দিষ্ট সাইবার অপরাধ দমনে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। পরবর্তীতে, ২০২৪ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) কার্যকর হলেও, মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার প্রদানে এর সীমাবদ্ধতাগুলো এখনও স্পষ্ট। যেমন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অবৈধভাবে প্রকাশিত বিষয়বস্তু দ্রুত অপসারণের জন্য যে ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আইনি কাঠামো প্রয়োজন, তা এখনো অপ্রতুল। একটি ভিডিও বা বই অনলাইনে একবার ছড়িয়ে পড়লে, তা সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে প্রকৃত স্বত্বাধিকারী আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। উপরন্তু, ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পাইরেসি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবও এই সমস্যার তীব্রতা বাড়াচ্ছে। World Bank-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের কারণে জিডিপির ০.৫% থেকে ১% পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

ডিজিটাল জলদস্যুতার এই ভয়াবহতা মোকাবিলার জন্য শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এর কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শক্তিশালী করা অপরিহার্য। বিদ্যমান কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫) এবং প্রস্তাবিত কপিরাইট আইন ২০২৪-এ ডিজিটাল মেধাস্বত্ব সুরক্ষার বিধান থাকলেও, সাইবার স্পেসে এর প্রয়োগের জন্য বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুতগামী করা প্রয়োজন। বর্তমানে, সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার জট এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতাগুলো মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করছে। Asian Development Bank (ADB) তাদের ‘Digital Transformation for Development’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ডিজিটাল মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সফল হতে হলে দেশগুলোকে শুধু আইনগত কাঠামোর উন্নয়ন নয়, বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য, এই সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেমন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে একযোগে কাজ করতে হবে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং কপিরাইট আইনের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট এবং কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে, যাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনা দ্রুত সনাক্ত ও নিষ্পত্তি করা যায়।

বছর ডিজিটাল জলদস্যুতার কারণে আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি (কোটি টাকা) কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলার সংখ্যা মামলার নিষ্পত্তির হার (%)
২০২০ ৩৫০ ১৫০ ৪০%
২০২১ ৪২০ ১৮০ ৩৫%
২০২২ ৪৮০ ২২০ ৩০%
২০২৩ ৫৫০ ২৭০ ২৫%

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস ও বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন, ২০২৩

সুপারিশ

  • ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০২৪ (সাইবার নিরাপত্তা আইন)-এর অধীনে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট ধারা সংযোজন এবং কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫)-এর সঙ্গে এর প্রয়োগিক সমন্বয়ের জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি টাস্কফোর্স গঠন করা।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের যৌথ উদ্যোগে একটি 'ডিজিটাল মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করা, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অবৈধ কনটেন্ট দ্রুত সনাক্তকরণ ও অপসারণের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি (যেমন - AI-ভিত্তিক কনটেন্ট রিকগনিশন টুল) ব্যবহার করবে এবং ISP (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
  • World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালগুলোতে মেধাস্বত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষিত বিচারক ও প্রসিকিউটর নিয়োগের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি বিশেষ বাজেট বরাদ্দ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator