বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন (DeFi): বাংলাদেশের সম্ভাব্যতা ও আইনি জটিলতা | আই নিউজ বিডি

বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন (DeFi): বাংলাদেশের সম্ভাব্যতা ও আইনি জটিলতা

সাজিদ মাহমুদ  avatar   
সাজিদ মাহমুদ
বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন (DeFi): বাংলাদেশের সম্ভাব্যতা ও আইনি জটিলতা
বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন (DeFi): বাংলাদেশের সম্ভাব্যতা ও আইনি জটিলতা
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন ও প্রচারণার বিষয়ে প্রকাশিত সতর্কতা বিজ্ঞপ্তিটি দেশের ডিজিট...

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন ও প্রচারণার বিষয়ে প্রকাশিত সতর্কতা বিজ্ঞপ্তিটি দেশের ডিজিটাল অর্থায়ন খাতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তি, যা মূলত বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারা উল্লেখ করে জারি করা হয়েছিল, বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন (DeFi) প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং এর আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়। যদিও BTRC-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ আর্থিক কার্যকলাপ রোধ করা, তবে এটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্লকচেইন-ভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়নের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির প্রতি সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, বিশেষ করে যখন বিশ্বের অনেক দেশ DeFi-কে তাদের ফিনটেক ইকোসিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

বাংলাদেশের জন্য বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন (DeFi) কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রবণতা নয়, বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহকে আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী করার এক বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আসে। যেখানে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থা এখনও দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার বাইরে রেখেছে, সেখানে DeFi ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই লেনদেন, ঋণ গ্রহণ ও সঞ্চয়ের সুযোগ করে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SME) প্রচলিত ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে যে দীর্ঘসূত্রিতা ও উচ্চ সুদের হারের সম্মুখীন হন, DeFi প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের জন্য আরও সহজ ও স্বল্প সুদের বিকল্প প্রস্তাব করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন (IFC) এর একটি গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশে SME খাতের জন্য প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি অর্থায়ন ব্যবধান রয়েছে, যা DeFi-এর মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। এছাড়াও, দেশের প্রায় ১ কোটিরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক প্রতি বছর প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠান, যার একটি বড় অংশ প্রচলিত চ্যানেলের উচ্চ ফি এবং ধীর গতির কারণে অনানুষ্ঠানিক পথে পরিচালিত হয়। DeFi-এর স্মার্ট কন্ট্রাক্ট-ভিত্তিক লেনদেন প্রবাসীদের জন্য দ্রুত, সুরক্ষিত এবং কম খরচে অর্থ প্রেরণের সুযোগ করে দিতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে, এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলনের আগে KYC (Know Your Customer) এবং AML (Anti-Money Laundering) এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য। বর্তমানে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) ক্রিপ্টোকারেন্সি-সম্পর্কিত মানি লন্ডারিং ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে সক্রিয় থাকলেও, DeFi-এর সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের সক্ষমতা এবং বিধিবদ্ধ ক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন।

DeFi-এর সম্ভাবনা যেমন বিশাল, তেমনি এর সাথে জড়িত আইনি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতাও কম নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। দেশের বিদ্যমান আইন ও নীতিগুলি প্রধানত কেন্দ্রীভূত আর্থিক ব্যবস্থার জন্য তৈরি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ (যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক) লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। DeFi-এর বিকেন্দ্রীভূত প্রকৃতি এই প্রচলিত কাঠামোর সাথে সংঘাত তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ডিজিটাল অ্যাসেট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিকে এখনও সিকিউরিটিজ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেনি, যা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করে। এছাড়াও, স্মার্ট কন্ট্রাক্টের আইনি স্বীকৃতি, ব্লকচেইন-ভিত্তিক ডেটা সংরক্ষণ এবং ডেটা গোপনীয়তা (Data Privacy) সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নির্দেশিকা এখনও অনুপস্থিত। ICT Division এবং a2i (Access to Information) প্রোগ্রাম, ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও, ব্লকচেইন এবং DeFi-এর আইনি কাঠামো নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা এখনও প্রণয়ন করতে পারেনি। BHTPA (Bangladesh Hi-Tech Park Authority) দেশের প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে কাজ করলেও, DeFi স্টার্টআপগুলোর জন্য বিশেষ ইনসেনটিভ বা নিয়ন্ত্রক স্যান্ডবক্স (Regulatory Sandbox) তৈরির কোনো উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে, BASIS (Bangladesh Association of Software and Information Services) ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ব্লকচেইন নিয়ে আলোচনায় সক্রিয় থাকলেও, এর বাণিজ্যিক প্রয়োগ এবং আইনি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিতে পারেনি। এই প্রযুক্তিগত শূন্যতা এবং আইনি অস্পষ্টতা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য DeFi-ভিত্তিক উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে কাজ করাকে কঠিন করে তুলছে, কারণ তারা প্রায়শই বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ার ঝুঁকির সম্মুখীন হন।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
বৈশ্বিক DeFi বাজার মূলধন (বিলিয়ন USD) ১৩.৪ ১৫০.৫ ৪৫.৮ ৭০.৩
বৈশ্বিক ব্লকচেইন প্রযুক্তি বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ৪.১ ৭.৫ ৫.৯ ৮.১
BTRC-এর ক্রিপ্টোকারেন্সি সতর্কতা বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা ০ ১ ১ ১
ICT Division-এর ব্লকচেইন কৌশল ডকুমেন্ট (প্রকাশিত) ০ ০ ১ (খসড়া) ০
BASIS সদস্য প্রতিষ্ঠানের ব্লকচেইন প্রকল্প ৫ ১২ ২০ ৩০

উৎস: CoinMarketCap, PwC Global Blockchain Report, BTRC প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি, ICT Division এর অভ্যন্তরীণ নথি, BASIS বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • ICT Division এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সমন্বয়ে একটি 'জাতীয় ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি নীতিমালা' প্রণয়ন করা, যেখানে DeFi-এর মতো বিকেন্দ্রীভূত আর্থিক পরিষেবাগুলির সংজ্ঞা, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এই নীতিমালায় স্মার্ট কন্ট্রাক্টের আইনি বৈধতা এবং ডিজিটাল অ্যাসেটের শ্রেণিবিভাগ অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক।
  • BTRC, BFIU এবং BSEC-এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা, যা DeFi-এর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের (যেমন FATF) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার জন্য একটি 'রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স' চালু করবে। এই স্যান্ডবক্সের মাধ্যমে স্টার্টআপগুলিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তাদের DeFi পণ্য ও পরিষেবা পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়া হবে।
  • a2i এবং BHTPA-এর তত্ত্বাবধানে একটি 'ব্লকচেইন ইনোভেশন হাব' প্রতিষ্ঠা করা, যা DeFi-ভিত্তিক স্টার্টআপগুলির জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা, মেন্টরশিপ এবং প্রাথমিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়াও, BASIS-এর সহযোগিতায় ব্লকচেইন ডেভেলপার ও ফিনটেক উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা উচিত, যাতে স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষ জনবল তৈরি হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাজিদ মাহমুদ

সাজিদ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator