কারিগরি শিক্ষায় ডিজিটাল দক্ষতা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি শিক্ষায় ডিজিটাল দক্ষতা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি শিক্ষায় ডিজিটাল দক্ষতা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান
কারিগরি শিক্ষায় ডিজিটাল দক্ষতা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০২১-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন’ অনুসারে, দেশের কারিগরি ও বৃ...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০২১-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন’ অনুসারে, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) খাতে ডিজিটাল দক্ষতার মানোন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪০% অর্জিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যেখানে উন্নত দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও ডেটা অ্যানালিটিক্সে দক্ষ জনবল তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, সেখানে আমাদের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও পুরনো সিলেবাস আর সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে ধুঁকছে। বিশেষত, শিল্প-কারখানার চাহিদা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগানের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান সুস্পষ্ট, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন অত্যাবশ্যক হলেও, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর আওতাধীন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর বর্তমান অবস্থা আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর ২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০% কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগের গতি ধীর অথবা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এছাড়াও, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব ও সফটওয়্যারের অপ্রতুলতা একটি প্রধান সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ, অটোমেশন এবং সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমের মতো বিষয়গুলি তাত্ত্বিকভাবে পড়ানো হলেও, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের অভাব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে, বেসরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো কিছুটা আধুনিক হলেও, সেগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়নে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই ঘাটতিগুলো শিক্ষার্থীদের কেবল চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে না, বরং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক পরিচালিত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বশেষ গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী গবেষণায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে, এই বাজেট গতানুগতিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কাজেই ব্যয়িত হয়, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত গবেষণায় তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। উদাহরণস্বরূপ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং বা ব্লকচেইন প্রযুক্তির মতো উচ্চ-প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ গবেষক ও প্রশিক্ষক তৈরির জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। ফলস্বরূপ, আমাদের কারিগরি গ্র্যাজুয়েটরা বৈশ্বিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়ছে এবং দেশের শিল্প খাতকে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, নীতিগত সদিচ্ছা থাকলেও তার বাস্তবায়নে পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর (লক্ষ্যমাত্রা) ২০২২-২৩ অর্থবছর (অর্জন) বাস্তবতার ব্যবধান (%)
ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষিত TVET শিক্ষার্থী ১,৫০,০০০ ৮২,৫০০ ৪৫%
আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব সহ TVET প্রতিষ্ঠান ১,২০০ ৫৪০ ৫৫%
শিল্প-সংযুক্ত ডিজিটাল পাঠ্যক্রমের সংখ্যা ৫০ ১৮ ৬৪%
ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক (TVET) ১০,০০০ ৩,৫০০ ৬৫%

উৎস: জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর সমন্বিত প্রতিবেদন, ২০২৩।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'জাতীয় কারিগরি শিক্ষা নীতি ২০২২' (প্রস্তাবিত) এর আওতায় একটি 'ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে উচ্চগতির ইন্টারনেট, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যার নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং UGC কে যৌথভাবে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যক্রম (যেমন - অ্যাডভান্সড রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং) তৈরির জন্য একটি 'শিল্প-শিক্ষা অংশীদারিত্ব প্রোগ্রাম' চালু করতে হবে, যেখানে প্রতি বছর ন্যূনতম ২০টি নতুন কোর্স ডিজাইন এবং প্রতিটি কোর্সের জন্য শিল্প বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল' থেকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে।
  • BANBEIS এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে নিয়মিতভাবে (প্রতি ৬ মাস অন্তর) দেশের সকল কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতার একটি বিস্তারিত নিরীক্ষা (Digital Competency Audit) পরিচালনা করতে হবে, এবং এই নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য 'বিশেষ ডিজিটাল রূপান্তর প্যাকেজ' (Special Digital Transformation Package) ঘোষণা করতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন এবং প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator