স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন: ডেটা সুরক্ষায় রোগীর অধিকার ও আইনি কাঠামো | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন: ডেটা সুরক্ষায় রোগীর অধিকার ও আইনি কাঠামো

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন: ডেটা সুরক্ষায় রোগীর অধিকার ও আইনি কাঠামো
স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন: ডেটা সুরক্ষায় রোগীর অধিকার ও আইনি কাঠামো
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালের মে মাসে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, কোভিড-১৯ মহামারী স্বাস্থ্যসেবা বিতরণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্য...

২০২২ সালের মে মাসে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, কোভিড-১৯ মহামারী স্বাস্থ্যসেবা বিতরণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করেছে, বিশেষ করে টেলিমেডিসিন পরিষেবাগুলির প্রসারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ এবং বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলি এই সময়ে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে এই দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে রোগী ডেটার সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং আইনি কাঠামোর দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি, একটি বেসরকারি টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মের ডেটাবেস থেকে কিছু রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়, যা স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি খাতে ডেটা সুরক্ষার গুরুত্বকে পুনরায় সামনে এনেছে। এই ঘটনাটি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রবৃদ্ধি এবং রোগীর অধিকার সুরক্ষার মধ্যে একটি নাজুক ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং টেলিমেডিসিনের দ্রুত বিকাশ রোগীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও, এর সাথে ডেটা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জগুলিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে, যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (DSA) ডেটা সুরক্ষার কিছু দিক কভার করে, সেখানে স্বাস্থ্য খাতের নির্দিষ্ট ডেটা সুরক্ষার জন্য একটি সমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এখনো পুরোপুরি অনুপস্থিত। রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য, যেমন তাদের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার ইতিহাস, ওষুধপত্রের বিবরণ এবং ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র নম্বর, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ডেটা যদি অননুমোদিতভাবে অ্যাক্সেস করা হয় বা ফাঁস হয়ে যায়, তবে রোগীদের আর্থিক ক্ষতি, সামাজিক কলঙ্ক এবং এমনকি ভুল চিকিৎসার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'Digital Health in Asia and the Pacific' শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই অঞ্চলের দেশগুলিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটাতে হলে সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, বিশেষ করে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) ভিত্তিক স্বাস্থ্য সমাধানগুলি বাড়ছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে টেলিমেডিসিন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি পরিষেবাগুলির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও, রোগীর অধিকার এবং ডেটা সুরক্ষার বিষয়ে সচেতনতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায়শই ডেটা সুরক্ষা প্রোটোকল এবং নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা নিরীক্ষা (audit) প্রদানে পিছিয়ে থাকে। রোগীদেরও তাদের ডেটার ব্যবহার এবং সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে না, যা তাদের ডেটা সুরক্ষা অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রতিকার চাইতে বাধা দেয়। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এর মধ্যে একটি সমন্বিত নীতিমালার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, টেলিমেডিসিন গাইডলাইন ২০২০ (Telemedicine Guideline 2020) কিছু দিক নির্দেশনা দিলেও, এটি ডেটা সুরক্ষা, ডেটা সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক ডেটা স্থানান্তর সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলি সম্পূর্ণরূপে সমাধান করতে পারেনি। ফলে, রোগীর সম্মতি ছাড়া ডেটা সংগ্রহ, ব্যবহার বা তৃতীয় পক্ষের সাথে শেয়ার করার সুযোগ তৈরি হয়, যা রোগীর মৌলিক গোপনীয়তার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে টেকসই করতে হলে একটি শক্তিশালী আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অপরিহার্য করে তোলে।

বছর টেলিমেডিসিন ব্যবহারকারীর সংখ্যা (আনুমানিক, লাখ) স্বাস্থ্য ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনা (প্রতিবেদিত) ডিজিটাল স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD)
২০২০ ৩০ ৫ ১০
২০২১ ৭৫ ১২ ১৫
২০২২ ১২০ ২০ ২৫
২০২৩ ১৮০ ৩৫ ৪০

উৎস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার; World Bank ও ADB এর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে অনুমান।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত 'স্বাস্থ্য ডেটা সুরক্ষা আইন' প্রণয়ন করতে হবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR এবং ভারতের Personal Data Protection Bill এর আদলে রোগীর সংবেদনশীল স্বাস্থ্য ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং স্থানান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা ও জরিমানা অন্তর্ভুক্ত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি 'জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ' (National Health Data Protection Authority) প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যা স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলির ডেটা সুরক্ষা মান নিরীক্ষণ করবে এবং রোগীর ডেটা সুরক্ষা অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে World Bank এবং ADB এর সহায়তায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য অত্যাধুনিক সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং কর্মীদের জন্য নিয়মিত ডেটা সুরক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায় এবং ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator