সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও স্বাধীনতা সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা জারি করার বিষয়টি আবারও করপোরেট সুশাসনের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। বিশেষত, যখন দেখা যাচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা কোম্পানি ব্যবস্থাপনার ওপর কার্যকর নজরদারি বা স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে কেবল বিধিবদ্ধ নিয়ম পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। এই নতুন নির্দেশিকা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেমন World Bank এবং ADB, বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছে। তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন বিনিয়োগ পরিবেশকে ব্যাহত করছে এবং পুঁজি বাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই নির্দেশিকা কি সত্যিই স্বাধীন পরিচালকদের স্বকীয়তা নিশ্চিত করে করপোরেট সুশাসনের মান উন্নত করবে, নাকি এটি কেবল আরও একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে – এই প্রশ্নটি এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্বাধীন পরিচালকদের মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির নির্বাহী পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা আনা এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, অনেক সময় দেখা যায় যে স্বাধীন পরিচালকরা কোম্পানির উদ্যোক্তা বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠজন অথবা তাদের দ্বারা মনোনীত ব্যক্তি হয়ে থাকেন, যা তাদের স্বাধীন বিচার-বিবেচনার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বাধীন পরিচালকদের তাদের মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করে এবং তাদের ভূমিকা কেবল বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। উদাহরণস্বরূপ, কোম্পানি আইনের অধীনে গঠিত বোর্ডগুলোতে স্বাধীন পরিচালকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও, তাদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং নির্বাহী পর্ষদের উপর নির্ভরশীলতা প্রায়শই তাদের কার্যকারিতাকে খর্ব করে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত অর্থ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সময় করপোরেট সুশাসন জোরদার করার জন্য নীতিগত পদক্ষেপ নিলেও, এর কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এই ঘাটতিগুলি মূলত নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর তদারকির দুর্বলতা এবং আইনি কাঠামোর ফাঁকফোকরের কারণে ঘটে থাকে, যা স্বাধীন পরিচালকদের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন করে তোলে।
World Bank-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে স্বাধীন পরিচালকদের গড় মেয়াদ এবং তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কাছাকাছি হলেও, তাদের কার্যকর ভূমিকা পালনে সংস্কৃতিগত এবং কাঠামোগত বাধা বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে, স্বাধীন পরিচালকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকে না, যা তাদের জটিল আর্থিক বা কৌশলগত বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। এছাড়া, তাদের পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রায়শই কোম্পানির নির্বাহী পর্ষদ দ্বারা নির্ধারিত হয়, যা তাদের স্বাধীনতার উপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। ADB-এর 'Corporate Governance in Developing Asia' শীর্ষক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে, স্বাধীন পরিচালকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, তাদের গুণগত মান এবং পর্ষদে তাদের প্রভাব এখনও যথেষ্ট নয়। এই পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে, যেখানে বোর্ড সদস্যরা নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং স্বাধীন পরিচালকরা নীরব দর্শক হয়ে থাকেন। ফলস্বরূপ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কেবল নতুন আইন বা নির্দেশিকা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এর কঠোর প্রয়োগ এবং স্বাধীন পরিচালকদের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থার প্রয়োজন, যা তাদের নির্ভয়ে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে।
| প্রতিষ্ঠানের ধরণ | স্বাধীন পরিচালকদের গড় অনুপাত (২০২২) | গড় বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিতি হার (২০২২) | সুশাসন সংক্রান্ত জরিমানা (২০২২-২৩) |
|---|---|---|---|
| তালিকাভুক্ত ব্যাংক | ৩৩% | ৮৮% | ৬.২ কোটি টাকা |
| তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান | ৩০% | ৮৫% | ৪.৫ কোটি টাকা |
| তালিকাভুক্ত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান | ২৫% | ৮০% | ৮.৭ কোটি টাকা |
| তালিকাভুক্ত সেবা প্রতিষ্ঠান | ২৭% | ৮২% | ৩.১ কোটি টাকা |
উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক জারি করা নতুন নির্দেশিকার কঠোর ও নিয়মিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, এবং স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন মূল্যায়ন সংস্থা (যেমন: কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড অনুসারে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টরস পুল) দ্বারা যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর অধীনে স্বাধীন পরিচালকদের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুস্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে, যাতে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাহী পর্ষদের হস্তক্ষেপ সীমিত হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক তাদের কার্যকারিতা নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
- World Bank এবং ADB-এর সুপারিশমালা অনুসরণ করে স্বাধীন পরিচালকদের জন্য নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যা তাদের আর্থিক বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আইনি বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি করবে এবং এর জন্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (BICM) এর মতো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।