নেতৃত্বের চোখে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নেতৃত্বের চোখে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
নেতৃত্বের চোখে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ
নেতৃত্বের চোখে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদার করার নির্দেশিকা জারির প্রেক্ষাপট কর্...

সম্প্রতি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদার করার নির্দেশিকা জারির প্রেক্ষাপট কর্মী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও ইউজিসি’র এই উদ্যোগ মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য, এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি কর্পোরেট জগতেও সমান প্রাসঙ্গিক। কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরব সংকট বহু বছর ধরেই চলে আসছে, যা উৎপাদনশীলতা, কর্মীদের ধরে রাখা এবং সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে, যখন দূরবর্তী কাজ এবং কাজের অনিশ্চয়তা মানসিক চাপকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে, তখন এই বিষয়টি নেতৃত্বের চোখে আরও বেশি মনোযোগের দাবি রাখে। দেশের বৃহৎ কর্পোরেশন থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ পর্যন্ত, কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এখন কেবল মানবিকতার প্রশ্ন নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের টেকসই সাফল্যের একটি অপরিহার্য কৌশলগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার উন্নয়নে মানসিক স্থিতিশীলতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দেখা গেছে, মানসিক চাপে ভোগা কর্মীরা তাদের পূর্ণ দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন না, যার ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং মানসম্মত কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আইটি পরিষেবা শিল্পে, যেখানে কর্মীদের উচ্চ চাপ এবং দীর্ঘ কাজের সময় সাধারণ ব্যাপার, সেখানে উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এই পরিস্থিতি কেবল কর্মীদের কর্মজীবনেই নয়, তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক সময় কর্মীরা তাদের মানসিক চাপ বা উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা করেন, কারণ তারা মনে করেন এটি তাদের কর্মজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বা তাদের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে। এই 'স্টিকমা' বা কলঙ্ক ভয় নীরব সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সহানুভূতির অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার কাঠামোবিহীন পরিবেশ এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলস্বরূপ, কর্মীরা নীরবে যন্ত্রণা ভোগ করেন, যা শেষ পর্যন্ত কর্মীদের অনুপস্থিতি, কর্মস্থল ত্যাগ এবং সামগ্রিক কর্মপরিবেশের অবনতি ঘটায়।

এই নীরব সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও টেকসই পদ্ধতির প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদিও মূলত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়, তাদের কর্মসূচিতে কর্মীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও পরোক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীর পাশাপাশি মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্যমতে, কর্মজীবনের শুরুতে তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ মোকাবেলা করার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে, যা তাদের কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। নেতৃত্বের উচিত, কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করা যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনাকে উৎসাহিত করা হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কাউন্সেলিং পরিষেবা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ এবং এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা যেখানে কর্মীদের কাজের চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ থাকে। প্রতিষ্ঠানের এইচআর বিভাগকে এই বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে একটি কার্যকরী ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

সূচক ২০২০ (শতাংশ) ২০২১ (শতাংশ) ২০২২ (শতাংশ)
কর্মক্ষেত্রে উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগা কর্মীদের হার (স্ব-প্রতিবেদিত) ১৮.৫% ২৩.২% ২৫.১%
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার সুবিধা গ্রহণকারী কর্মীদের হার ৫.৩% ৭.১% ৮.৯%
মানসিক স্বাস্থ্য সুবিধার পর্যাপ্ততা সম্পর্কে সন্তুষ্টির হার ৩৫% ৩৮% ৪২%

উৎস: বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং বিভিন্ন এইচআর সমীক্ষার সংকলন।

সুপারিশ

  • প্রতিটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর অধীনে কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধারাগুলোর পরিধি বৃদ্ধি করে মানসিক স্বাস্থ্যকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন করা। এই নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, কাউন্সেলিং পরিষেবা এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের বাধ্যতামূলক সংস্থান নিশ্চিত করার নির্দেশনা থাকবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর মাধ্যমে পরিচালিত সকল দক্ষতা উন্নয়ন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কর্মীদের মানসিক স্থিতিশীলতা এবং মানসিক চাপ মোকাবেলার কৌশল সম্পর্কিত মডিউল বাধ্যতামূলক করা। এটি কর্মজীবনের শুরুতে তরুণ কর্মীদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর সহযোগিতায়, কর্পোরেট নেতৃত্ব এবং এইচআর পেশাদারদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রাথমিক সহায়তা প্রশিক্ষণের একটি জাতীয় সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চালু করা। এই প্রোগ্রামটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (BIM) বা অন্যান্য স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হতে পারে, যা কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান 'কলঙ্ক' দূর করতে এবং সহানুভূতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator