মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: ভুক্তভোগী সুরক্ষায় আইনের ফাঁক কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: ভুক্তভোগী সুরক্ষায় আইনের ফাঁক কোথায়?

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: ভুক্তভোগী সুরক্ষায় আইনের ফাঁক কোথায়?
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: ভুক্তভোগী সুরক্ষায় আইনের ফাঁক কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে মানব পাচার সংশ্লিষ্ট মামলার নিষ্পত্তির হার উদ্বেগজনকভাবে কম। যেখানে সারাদ...

সম্প্রতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে মানব পাচার সংশ্লিষ্ট মামলার নিষ্পত্তির হার উদ্বেগজনকভাবে কম। যেখানে সারাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে প্রায় ৫,০০০ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, সেখানে মাত্র ৭% মামলা চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছেছে, যার মধ্যে দণ্ডের হার আরও কম। এই পরিসংখ্যান কেবল আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নয়, বরং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২' এবং 'বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩' প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানব পাচার রোধ এবং অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা করা। কিন্তু, বাস্তবতা হলো, আইনের ফাঁকফোকর এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতা পাচারকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে, আর ভুক্তভোগীরা রয়ে যাচ্ছেন অরক্ষিত।

বাংলাদেশের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২, নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল, যা মানব পাচারের সংজ্ঞা, শাস্তি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিস্তারিত রূপরেখা দিয়েছে। এই আইনে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যেমন – ভুক্তভোগীদের আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি। তবে, আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে, যার ফলে তারা প্রায়শই ভয়ভীতি বা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সাক্ষ্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। উপরন্তু, আইনের ধারাগুলোতে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের 'অপরাধী' হিসেবে দেখার প্রবণতা দূর করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণের অভাব এই মানসিকতা পরিবর্তনে বাধা সৃষ্টি করছে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য 'বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩' অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সুসংহত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু অনিয়মিত অভিবাসনের মূল কারণগুলো, যেমন – সঠিক তথ্যের অভাব, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, এবং দালালদের দৌরাত্ম্য – প্রতিরোধে এর প্রয়োগ সীমিত।

ভুক্তভোগী সুরক্ষার ক্ষেত্রে আইনের একটি বড় ফাঁক হলো, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত সনাক্তকরণ এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত কাঠামোগত অভাব। আইন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা কেন্দ্র (shelter home) এবং পুনর্বাসন তহবিলের কথা বলা হলেও, বাস্তবে এগুলোর সংখ্যা অপ্রতুল এবং বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর মান প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে, নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সেবার অভাব প্রকট। যখন একজন ভুক্তভোগী বিদেশ থেকে ফেরত আসেন, তখন তাকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী মনো-সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন, তার জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এডিবি (ADB) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে অনিয়মের কারণে সৃষ্ট পাচারের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য আরও সুসংহত পুনর্বাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এই সুপারিশগুলো পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অভিবাসীদের দেখভাল করলেও, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে।

এছাড়াও, আইনের প্রয়োগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মানব পাচার একটি আন্তঃদেশীয় অপরাধ, যা মোকাবেলায় অন্যান্য দেশের সাথে কার্যকর তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ তদন্ত অপরিহার্য। 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২'-এ আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ রাখা হলেও, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকের অভাব বা সেগুলোর দুর্বল বাস্তবায়ন পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক সময়, পাচারকারীরা বিদেশে অবস্থান করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়ে অঙ্গীকার করলেও, মাঠ পর্যায়ে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন এখনো সেভাবে দেখা যায় না। এর ফলে, পাচারকারীরা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

সাল মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দায়েরকৃত মামলা (আনুমানিক) নিষ্পত্তিকৃত মামলা (আনুমানিক) দণ্ডপ্রাপ্তির হার (%) World Bank/ADB থেকে সহায়তা (মিলিয়ন USD)
২০২০ ১,৬০০ ১০০ ৫% ৫০
২০২১ ১,৮৫০ ১৩০ ৬% ৬০
২০২২ ১,৫০০ ১১০ ৭% ৭০

উৎস: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর এবং বিশ্বব্যাংক/এডিবি প্রতিবেদন (২০২০-২০২২ এর গড় পরিসংখ্যান ভিত্তিক)

সুপারিশ

  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ এবং বিচারক ও সহায়ক জনবল বৃদ্ধি করা, যাতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং ভুক্তভোগীরা সময়মতো ন্যায়বিচার পান।
  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা, যার কাজ হবে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত সনাক্তকরণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, এবং বিশ্বব্যাংক/এডিবি প্রদত্ত সহায়তা কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা।
  • বাংলাদেশ সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাচার প্রবণ দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং তথ্য আদান-প্রদান প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে, যাতে আন্তঃদেশীয় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হয় এবং 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২'-এর আন্তর্জাতিক প্রয়োগ নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator