ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে গ্রাহক, দায় কার? | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে গ্রাহক, দায় কার?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে গ্রাহক, দায় কার?
ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি জটের ফাঁদে গ্রাহক, দায় কার?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো...

সম্প্রতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে পণ্য ডেলিভারি বিলম্ব এবং গ্রাহক হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) শুধুমাত্র ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ই-কমার্স সম্পর্কিত প্রায় ২৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে, যার একটি বড় অংশই ছিল পণ্য ডেলিভারি না হওয়া অথবা দেরিতে ডেলিভারি সংক্রান্ত। এই চিত্র কেবল একটি প্রশাসনিক উপাত্ত নয়, এটি দেশের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল কমার্স খাতের একটি গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ, যা লাখ লাখ গ্রাহককে প্রতিনিয়ত ভোগাচ্ছে এবং এই খাতের প্রতি তাদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।

এই ডেলিভারি জট কেবল গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতি বা সময়ের অপচয় নয়, এটি সামগ্রিকভাবে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়শই পণ্য সরবরাহের জন্য তৃতীয় পক্ষের লজিস্টিকস সেবার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা, বিশেষ করে শেষ মাইল ডেলিভারিতে (last-mile delivery) তাদের দুর্বল অবকাঠামো, কর্মী সংকট এবং প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা প্রায়শই পণ্য সরবরাহে বিলম্বের কারণ হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিক্রেতা পণ্য ডেলিভারি পার্টনারের কাছে সময়মতো হস্তান্তর করলেও, সেই পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতা হয়। এছাড়া, অনেক ছোট এফ-কমার্স উদ্যোক্তা নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থা পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, যেখানে তাদের পণ্য ব্যবস্থাপনা বা লজিস্টিকস সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই। এর ফলে, পণ্য ভুল ঠিকানায় যাওয়া, পণ্যের মান খারাপ হওয়া অথবা পণ্য হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে। এমনকি, NBR এর অধীনে ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতাও অনেক সময় আন্তর্জাতিক ই-কমার্স পণ্য ডেলিভারিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে, যেখানে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়।

ডেলিভারি জটের আরেকটি অন্যতম কারণ হলো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর দুর্বল ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রয়োত্তর সেবার অভাব। অনেক প্ল্যাটফর্ম অতিরিক্ত অর্ডার গ্রহণ করে ফেলে যা তাদের সরবরাহের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, ফলে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব বা ছাড়ের মৌসুমে (যেমন ঈদ, বৈশাখ, ব্ল্যাক ফ্রাইডে) এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি আকারের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৪০% এরও বেশি তাদের ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে যথেষ্ট বিনিয়োগ করে না, যা ডেলিভারি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। অন্যদিকে, অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতেও ধীরগতি দেখায়, যার ফলে গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। BSEC এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগকারীরাও মাঝে মাঝে ই-কমার্স কোম্পানির শেয়ারের মূল্য পতনে ক্ষতিগ্রস্ত হন যখন ডেলিভারি বা পরিষেবা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসে, যা পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিষয় ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর পরিবর্তনের হার (%)
ই-কমার্স সম্পর্কিত ভোক্তা অভিযোগ (ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর) ১৯,২৫০ ২৫,১২০ +৩০.৪৮%
ডেলিভারি বিলম্ব/অপ্রাপ্তি সংক্রান্ত অভিযোগের অনুপাত ৬২% ৬৭% +৮.০৬%
আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি (কোটি টাকা) ১৫৫ ২১০ +৩৫.৪৮%
ই-কমার্স খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (EPB রিপোর্ট অনুযায়ী) ২৫% ২২% -১২.০০%

উৎস: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিপিডি গবেষণা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, EPB।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি কার্যকর 'ডিজিটাল কমার্স লজিস্টিকস নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ডেলিভারি সময়সীমা, শেষ মাইল ডেলিভারি পার্টনারদের জন্য লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। এই নীতিমালায় গ্রাহকের ক্ষতিপূরণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি দ্রুত প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে ই-কমার্স পণ্য, বিশেষত আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা পণ্যের শুল্কায়ন ও খালাস প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করতে হবে। একটি স্বয়ংক্রিয় অনলাইন শুল্কায়ন পদ্ধতি চালু করে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে, যাতে পণ্য বন্দরে আটকে থাকার কারণে ডেলিভারি বিলম্ব না হয়।
  • ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত ডিজিটাল কমার্স অভিযোগ সেল গঠন করতে হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন: ১৫ কর্মদিবস) নির্ধারণ করে দিতে হবে। এছাড়াও, নিয়মিত বাজার তদারকি ও আইন লঙ্ঘনের জন্য কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator