প্লাস্টিক দূষণ থেকে সম্পদ: বাংলাদেশের জন্য বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্লাস্টিক দূষণ থেকে সম্পদ: বাংলাদেশের জন্য বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
প্লাস্টিক দূষণ থেকে সম্পদ: বাংলাদেশের জন্য বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
প্লাস্টিক দূষণ থেকে সম্পদ: বাংলাদেশের জন্য বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র ২০২৩'-এর খসড়া চূড়ান্তকরণ বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দিগন্ত ...

সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র ২০২৩'-এর খসড়া চূড়ান্তকরণ বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য হলো, প্লাস্টিক দূষণকে একটি অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরিত করা এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণাকে মূলধারায় নিয়ে আসা। বিশেষ করে, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতের বর্জ্য এবং শহুরে প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা একাধারে পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়কেই ত্বরান্বিত করতে পারে। এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ সূচকে অন্যতম শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছে এবং এর বিরূপ প্রভাব কৃষি উৎপাদনশীলতা, মৎস্য সম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর স্পষ্টত দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেল মূলত একটি রৈখিক অর্থনীতি (linear economy) ভিত্তিক, যেখানে 'উৎপাদন-ব্যবহার-ফেলে দাও' নীতি অনুসরণ করা হয়। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বড় অংশ নদী, খাল এবং সমুদ্রে পতিত হয়ে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। গবেষণা অনুযায়ী, কৃষি জমিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মাটির উর্বরতা হ্রাস করছে এবং খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে, বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে পুনরায় উৎপাদন চক্রে ফিরিয়ে আনা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন, যা রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যৌথভাবে ধানের খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবহার করে উন্নত মানের কম্পোস্ট সার তৈরির প্রযুক্তির উপর কাজ করছে, যা কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এটি কেবল পরিবেশ দূষণই কমাবে না, বরং কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎসও তৈরি করবে।

প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রেও নতুন নতুন উদ্ভাবন দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট ও মাঝারি আকারের রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে উঠছে, যা ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল, ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করে নতুন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করছে। তবে, এই প্রক্রিয়াকে আরও সংগঠিত এবং সম্প্রসারিত করার জন্য সমন্বিত নীতিমালা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কৃষকদের মধ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিকের অযাচিত ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে এবং বিকল্প হিসেবে বায়োডিগ্রেডেবল বা বায়োপ্লাস্টিকের ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। একই সাথে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) প্লাস্টিক দূষণের কৃষিগত প্রভাব এবং এর টেকসই সমাধানের উপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের সঠিক সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হলে তা দেশের প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করতে পারে, যা কেবল স্থানীয় অর্থনীতির গতি বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিক পণ্যের চাহিদা মেটাতে সহায়ক হবে। এই উদ্যোগগুলো কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করছে।

প্লাস্টিক বর্জ্য সম্পর্কিত তথ্য (২০২২-২৩) পরিমাণ/শতাংশ উৎস
বার্ষিক প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ১০.৩৭ লক্ষ টন পরিবেশ মন্ত্রণালয়
পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্যের হার ৩৭% বিশ্বব্যাংক
কৃষি জমিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রতি কেজি মাটিতে গড়ে >১০০০ কণা BARC গবেষণা
শহুরে কঠিন বর্জ্যে প্লাস্টিকের অংশ ৯.৩% পরিবেশ অধিদপ্তর
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জিডিপির ক্ষতি ০.৮% (প্রাক্কলিত) জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক, BARC এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (২০২২-২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী)

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত 'জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র ২০২৩' দ্রুত চূড়ান্ত করে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যার নেতৃত্বে থাকবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, যাতে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
  • DAE, BARI, BRRI এবং BARC এর সমন্বয়ে একটি জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বায়োডিগ্রেডেবল পণ্য এবং কৃষি বর্জ্য থেকে উচ্চমূল্যের জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রযুক্তির উপর নিবিড় গবেষণা চালাবে এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর মাধ্যমে পাইলট প্রকল্প চালু করবে।
  • প্লাস্টিক উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য 'প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব (Extended Producer Responsibility - EPR)' নীতি বাধ্যতামূলক করে একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হোক, যেখানে উৎপাদিত প্লাস্টিক পণ্যের জীবনচক্র শেষে সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের দায়িত্ব তাদের উপর বর্তাবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর এই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator