সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: টাকার অবমূল্যায়ন বনাম মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: টাকার অবমূল্যায়ন বনাম মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্র

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: টাকার অবমূল্যায়ন বনাম মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্র
সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: টাকার অবমূল্যায়ন বনাম মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্র
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার আরও এক দফা সমন্বয়, বিশেষ করে গত ৮ মে, ২০২৪ তারিখে আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারকে মার্কেট-চালিত ক...

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার আরও এক দফা সমন্বয়, বিশেষ করে গত ৮ মে, ২০২৪ তারিখে আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারকে মার্কেট-চালিত করার সিদ্ধান্ত এবং একই সাথে নতুন 'ক্রলিং পেগ' পদ্ধতি প্রবর্তন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে টাকার মান আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ টাকা ৯০ পয়সা অবমূল্যায়িত হয়ে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অতীতের বহু বছরের ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার নীতি থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশের অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট, এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এই অবমূল্যায়ন একদিকে যেমন রপ্তানিকারকদের জন্য আপাত সুবিধা নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি অন্যদিকে আমদানি নির্ভর অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে টাকার বাস্তবসম্মত বিনিময় হার নির্ধারণের পক্ষে সওয়াল করে আসছিল, যা অর্থনীতির ভেতরের চাপকে দৃশ্যমান করবে বলে তারা মনে করে।

টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতির এই দুষ্টচক্র একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। যখন টাকার মান কমে যায়, তখন আমদানিকৃত পণ্যের দাম দেশীয় মুদ্রায় বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি তেল, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্প কাঁচামাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের একটি বড় অংশের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই টাকার অবমূল্যায়ন সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই বর্ধিত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যে যোগ হয়, যা মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৪-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৬৭ শতাংশ, যা গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৮৬ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং রপ্তানি আয় বাড়াতে টাকার অবমূল্যায়ন একটি স্বীকৃত নীতি হলেও, এর সুফল পেতে হলে রপ্তানি খাতকে প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে এবং আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বর্তমানে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৩.৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রত্যাশিত হারের চেয়ে কম। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। এই পরিস্থিতি টাকার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও তীব্র করছে।

এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কম ছিল। এই ঘাটতি সরকারি ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বাধা দিচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে কাজ করলেও, ডলার সংকটের কারণে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। টাকার অবমূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতির এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি, যেখানে একদিকে যেমন বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা আনা হবে, তেমনি অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ জোরদারকরণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে মনোযোগ দেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক সূচক মার্চ ২০২৩ মার্চ ২০২৪ এপ্রিল ২০২৪ (আনুমানিক)
সাধারণ মূল্যস্ফীতি (বিবিএস) ৯.২৪% ৯.৬৭% ৯.৭৪%
খাদ্য মূল্যস্ফীতি (বিবিএস) ৯.০৯% ৯.৮৬% ১০.২২%
ডলারের বিনিময় হার (আন্তঃব্যাংক) ১০৭.০০ টাকা ১১০.০০ টাকা ১১৭.০০ টাকা (৮ মে থেকে কার্যকর)
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিলিয়ন ডলার) ৩১.০৯ ২০.১১ (আইএমএফ হিসাব) ১৯.৯৯ (আইএমএফ হিসাব)

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

সুপারিশ

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কে আধুনিক প্রযুক্তি এবং ডেটা অ্যানালাইটিক্স ব্যবহার করে কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং করের আওতা বাড়াতে হবে, বিশেষত অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ডলার সংকটের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে, এবং এক্ষেত্রে বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ আইন (Market Monitoring and Control Act) কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে (BB) বিনিময় হার নীতিতে আরও পূর্বাভাসযোগ্যতা আনতে হবে এবং ক্রলিং পেগ পদ্ধতির কার্যকর বাস্তবায়ন ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি কেবল টাকার অবমূল্যায়নকে ত্বরান্বিত না করে, বরং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator