আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন কৃষি প্রকল্প: টেকসই উন্নয়নের পথে কাঁটা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন কৃষি প্রকল্প: টেকসই উন্নয়নের পথে কাঁটা?

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন কৃষি প্রকল্প: টেকসই উন্নয়নের পথে কাঁটা?
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন কৃষি প্রকল্প: টেকসই উন্নয়নের পথে কাঁটা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতের জন্য ঘোষিত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতের জন্য ঘোষিত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন কৃষি প্রকল্পের টেকসই উন্নয়নের পথে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই ঋণ প্যাকেজের শর্তাবলীতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, নির্দিষ্ট ফসলের জাত ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকায়, দেশের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের স্বাবলম্বিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্থানীয় জাতের ফসল এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতির গুরুত্ব যখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, তখন এমন শর্তাবলী দেশের কৃষি খাতের নিজস্ব সক্ষমতাকে খর্ব করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলো প্রায়শই তাদের কৃষি প্রকল্পে এমন শর্ত আরোপ করে, যা আপাতদৃষ্টিতে উৎপাদন বৃদ্ধি বা আধুনিকীকরণের দিকে পরিচালিত মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা স্থানীয় কৃষিব্যবস্থা এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) অর্থায়নে পরিচালিত সেচ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রায়শই এমন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানির শর্ত থাকে যা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা মেরামতযোগ্য নয়। এর ফলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশের জন্য বিদেশী নির্ভরতা তৈরি হয়, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করে। বিগত দশকে, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক (AfDB) কর্তৃক বিভিন্ন আফ্রিকান দেশে আরোপিত শর্তাবলী প্রমাণ করে যে, কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির উপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ায় স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং ক্ষুদ্র কৃষকরা বৃহৎ বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থার সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। এই ধরনের শর্তাধীন ঋণগুলো প্রায়শই দেশের নীতি-নির্ধারণী কাঠামোতে প্রভাব ফেলে, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ও পরিবেশগত সংবেদনশীলতার চেয়ে দাতা সংস্থার অগ্রাধিকারগুলো বেশি গুরুত্ব পায়। এটি কেবল দেশের সার্বভৌমত্বকেই চ্যালেঞ্জ করে না, বরং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), বিশেষ করে SDG 2 (ক্ষুধা মুক্তি) এবং SDG 12 (দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন) অর্জনের পথকেও জটিল করে তোলে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর শর্তাধীন প্রকল্পগুলো প্রায়শই দাতা দেশগুলোর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, কতিপয় আন্তর্জাতিক সংস্থা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতায় কৃষি অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে, যেখানে চীনা প্রযুক্তি ও শ্রম ব্যবহারের শর্ত থাকে। এই ধরনের প্রকল্পগুলো স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তেমন ভূমিকা রাখে না এবং দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হয় না। অন্যদিকে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের জন্য একটি কার্যকর প্রক্রিয়া থাকলেও, আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর এককেন্দ্রিক শর্তাবলী প্রায়শই আঞ্চলিক সহযোগিতার এই সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেয়। ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং শ্রীলঙ্কার কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ধান গবেষণায় যে সফল সহযোগিতা বিদ্যমান, তা আন্তর্জাতিক শর্তাধীন ঋণের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই ও স্থানীয় চাহিদাপূরণে সক্ষম। এমনকি, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও যখন ত্রাণ ও উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন করে, তখন তাদের শর্তাবলীতে স্থানীয় বাজার সুরক্ষা এবং কৃষকদের অধিকারের বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। UN Peacekeeping মিশনগুলো যেসব অঞ্চলে কাজ করে, সেখানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কৃষি উন্নয়নে তাদের ভূমিকা থাকলেও, আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার বৃহত্তর প্রকল্পগুলো প্রায়শই এই স্থানীয় উদ্যোগগুলোকে ছাপিয়ে যায়।

এছাড়াও, BIMSTEC দেশগুলোর মধ্যে কৃষি প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন প্রকল্পগুলো প্রায়শই সদস্য দেশগুলোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। মায়ানমারের ধানের জাত এবং থাইল্যান্ডের কৃষি প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির মধ্যে যে কার্যকর সমন্বয় সম্ভব, তা প্রায়শই দাতা সংস্থার আরোপিত নির্দিষ্ট প্রযুক্তির ব্যবহারের শর্তের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার সাথে আলোচনার সময় দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থার স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। এই সংস্থাগুলো প্রায়শই এমন পরিবেশগত মানদণ্ড আরোপ করে যা উন্নত দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। এর ফলে, পরিবেশ সংরক্ষণের নামে কৃষকদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হয়, যা তাদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং দারিদ্র্য বাড়ায়।

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থা প্রকল্পের নাম (উদাহরণ) মোট ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন ডলার) শর্তাবলী (উদাহরণ) স্থানীয় কৃষকের উপর প্রভাব (অনুমান)
বিশ্বব্যাংক (IBRD) Sustainable Agricultural Modernization Project (SAMP) ১.৫ নির্দিষ্ট উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার, রাসায়নিক সারের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ, নির্দিষ্ট সেচ প্রযুক্তি আমদানি। বীজ ও সারের জন্য বিদেশী নির্ভরতা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণগ্রস্ততা বৃদ্ধি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) Agricultural Productivity Enhancement Program (APEP) ২.২ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি আমদানি, রপ্তানি-ভিত্তিক কৃষি পণ্যে অগ্রাধিকার, বিদেশি বাজারমুখী উৎপাদন। স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত, কৃষিজাত পণ্যের মূল্য অস্থিরতা, স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ব্যাহত।
আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD) Rural Economic Transformation Project (RETP) ০.৮ নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার, জলবায়ু সহনশীল জাতের উপর জোর (প্রায়শই বিদেশি)। স্থানীয় পরিবেশের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবহার, ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতির অবহেলা, জীববৈচিত্র্য হ্রাস।
ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (IsDB) Food Security and Livelihood Improvement Project (FSLIP) ১.০ শস্য বহুমুখীকরণে নির্দিষ্ট পদ্ধতি, আধুনিক মৎস্য চাষের প্রযুক্তি, নির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ চ্যানেল। কৃষকদের বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হ্রাস, স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার উপর চাপ, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব বৃদ্ধি।

উৎস: বিশ্বব্যাংক বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-২৩, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক কৃষি খাত পর্যালোচনা ২০২৩, IFAD প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০২১, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীতি সারসংক্ষেপ ২০২৪।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলির সাথে আলোচনার সময় একটি 'জাতীয় কৃষি স্বার্থ সুরক্ষা আইন' (National Agricultural Interest Protection Act) প্রণয়ন ও কার্যকর করার জন্য চাপ দিতে হবে, যা দেশের খাদ্য সার্বভৌমত্ব, স্থানীয় জাতের সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত সংবেদনশীলতাকে অগ্রাধিকার দেবে। এই আইনের অধীনে, কোনো আন্তর্জাতিক ঋণ বা সহায়তা চুক্তি দেশের কৃষি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেললে তা বাতিল করার বিধান থাকতে হবে।
  • BIMSTEC এবং সার্কের মতো আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং বাজার সংযোগ জোরদার করার জন্য একটি 'আঞ্চলিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল' (Regional Agricultural Development Fund) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই তহবিলের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করতে পারবে, যা আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার শর্তাধীন ঋণের উপর নির্ভরতা কমাবে এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নে সহায়ক হবে।
  • জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-এর নীতি-নির্ধারণী ফোরামে UN Peacekeeping মিশনগুলোর জন্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্য সংগ্রহের একটি বাধ্যতামূলক নীতি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সক্রিয়ভাবে লবিং করতে হবে, যাতে স্থানীয় কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator