বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন

জাহিদ হাসান  avatar   
জাহিদ হাসান
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
ছবি: সংগৃহীত
গত ২ মে ২০২৪ তারিখে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (বিএস-২) নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যা...

গত ২ মে ২০২৪ তারিখে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (বিএস-২) নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়, যেখানে বিএসএল (Bangladesh Satellite Company Limited) এর মহাপরিচালক প্রকল্পটির সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরেন। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূ-পর্যবেক্ষণ বা আর্থ অবজার্ভেশন স্যাটেলাইট হিসেবে এটি বাংলাদেশের সক্ষমতাকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি বহন করে, যা কৃষি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং নগর পরিকল্পনা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অত্যাধুনিক ডেটা সরবরাহ নিশ্চিত করবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১) যেখানে মূলত টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবায় মনোনিবেশ করেছে, সেখানে বিএস-২ এর লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এটি দেশের ভূ-স্থানিক ডেটা চাহিদা পূরণে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এই নতুন স্যাটেলাইটটি অত্যাধুনিক অপটিক্যাল ও সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার (SAR) পেলোড দ্বারা সজ্জিত থাকবে, যা মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়াতেও উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি ও তথ্য সংগ্রহে সক্ষম হবে, যা দুর্যোগ প্রবণ বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর প্রাক্কলিত বাজেট প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর কারিগরি নকশা ও কার্যকারিতা নির্ধারণে স্পারসো (Space Research and Remote Sensing Organization) এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পারসো, দেশের একমাত্র মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন সংস্থা হিসেবে, বিএস-২ এর মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ ও ব্যবহার উপযোগী করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। তাদের বিশেষজ্ঞদের নিরন্তর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বিএস-২ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করবে, যা দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রদানে সহায়ক হবে। উদাহরণস্বরূপ, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সময় এটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার চিত্র সরবরাহ করে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে গতি আনবে। এছাড়া, বিএস-২ এর ডেটা ব্যবহার করে দেশের ভূ-সম্পদ জরিপ, খনিজ অনুসন্ধান এবং অবৈধ ভূমি দখল রোধে নজরদারি জোরদার করা সম্ভব হবে, যা পূর্বে প্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায়শই কঠিন ছিল।

এই ভূ-পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইটটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। বিটিআরসি (Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission) এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের টেলিকম অপারেটররা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করে ইন্টারনেট ও অন্যান্য যোগাযোগ সেবা সরবরাহ করছে। বিএস-২ সরাসরি টেলিকম সেবা না দিলেও, এর ভূ-পর্যবেক্ষণ ডেটা ব্যবহার করে স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা, স্মার্ট এগ্রিকালচার এবং স্মার্ট গভর্নেন্স এর মতো ইনিশিয়েটিভগুলোতে ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ মাছ ধরা বা বন উজাড়ের মতো পরিবেশগত অপরাধ দমনে এটি একটি কার্যকর নজরদারি টুল হিসেবে কাজ করবে। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত উচ্চ-রেজোলিউশনের চিত্র ব্যবহার করে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, যেমন পদ্মা সেতু বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ, আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। এটি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আরও সুদৃঢ় করবে, বিশেষ করে সীমান্ত নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সাল প্রধান উদ্দেশ্য ব্যয় (আনুমানিক) ট্রান্সপন্ডার সংখ্যা/ পেলোড কার্যকরী সময়কাল
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ২০১৮ যোগাযোগ ও সম্প্রচার ৳ ২,৭৬৫ কোটি ৪০টি (২৫টি ব্যবহারযোগ্য) ১৫ বছর
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ পরিকল্পিত (২০২৬) ভূ-পর্যবেক্ষণ (আর্থ অবজার্ভেশন) ৳ ৩,০০০ কোটি অপটিক্যাল ও SAR পেলোড ৭-১০ বছর (পরিকল্পিত)

উৎস: বিএসএল, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, স্পারসো

সুপারিশ

  • স্পারসো এর সক্ষমতা বৃদ্ধি: বিএস-২ থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ ভূ-পর্যবেক্ষণ ডেটা বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য স্পারসো এর প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অবিলম্বে 'জাতীয় মহাকাশ প্রযুক্তি উন্নয়ন নীতিমালা' এর অধীনে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হোক, যাতে তারা এই ডেটা ব্যবহার করে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
  • আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা কাঠামো: ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কর্তৃক 'ভূ-পর্যবেক্ষণ ডেটা ব্যবহার নীতিমালা' প্রণয়ন করে কৃষি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে বিএস-২ থেকে প্রাপ্ত ডেটা আদান-প্রদান ও সমন্বিত ব্যবহারের জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হোক।
  • বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও উদ্ভাবন: বিটিআরসি এর তত্ত্বাবধানে 'স্যাটেলাইট ডেটা সার্ভিসেস রেগুলেশন' তৈরি করে দেশীয় স্টার্টআপ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিএস-২ এর ডেটা অ্যাক্সেস এবং নতুন অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে উৎসাহিত করা হোক, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে ভূ-পর্যবেক্ষণ ডেটা থেকে উদ্ভাবনী সমাধান তৈরি করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator