গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিনের বিপ্লব: স্মার্টফোনই কি ভরসা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিনের বিপ্লব: স্মার্টফোনই কি ভরসা?

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিনের বিপ্লব: স্মার্টফোনই কি ভরসা?
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিনের বিপ্লব: স্মার্টফোনই কি ভরসা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৪'-এ স্মার্টফোন-ভিত্তিক টেলিমেডিসিন সেবাকে গ্রামীণ স...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৪'-এ স্মার্টফোন-ভিত্তিক টেলিমেডিসিন সেবাকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কৌশলে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫% গ্রামে বসবাস করে, যেখানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ৫.২ জন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মানদণ্ড থেকে অনেক নিচে। এই প্রেক্ষাপটে, গত তিন বছরে টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে প্রায় ১.৫ কোটি স্বাস্থ্য পরামর্শ পৌঁছেছে, যার মধ্যে সিংহভাগই স্মার্টফোন অ্যাপস এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় এক নীরব বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি সাধারণ স্মার্টফোনই হয়ে উঠেছে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের মূল মাধ্যম।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিনের এই উত্থান আকস্মিক নয়, বরং এটি দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অবকাঠামো এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের ব্যাপকতার প্রত্যক্ষ ফল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৮৫% ব্যবহারকারী মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এই বিশাল সংখ্যক স্মার্টফোন ব্যবহারকারী এবং তাদের ইন্টারনেট সংযোগ টেলিমেডিসিন সেবার জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষত কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে যখন সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন টেলিমেডিসিনই ছিল গ্রামীণ মানুষের ভরসা। অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ডাক্তারের চেম্বার বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার কয়েক কিলোমিটার দূরে, সেখানে স্মার্টফোনের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ, ফলো-আপ সার্ভিস এবং এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবাও প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এই সেবাগুলো কেবল সময় বাঁচায় না, বরং যাতায়াত খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে, যা গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় সুবিধা।

তবে, এই বিপ্লবের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। যদিও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক, গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এখনও একটি বড় বাধা। এছাড়া, টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত সফটওয়্যারগুলোর ব্যবহারিক জটিলতা এবং স্থানীয় ভাষায় স্বাস্থ্য তথ্যের অভাব অনেক বয়স্ক বা কম শিক্ষিত মানুষের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ হেলথ ইনিশিয়েটিভ'-এর আওতায় কিছু কমিউনিটি ক্লিনিককে টেলিমেডিসিন হাব হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চললেও, এর পরিধি এখনও সীমিত। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, যারা রোগীকে টেলিমেডিসিন কনসালটেশনে সহায়তা করতে পারেন এবং প্রাথমিক পরীক্ষার ডেটা সংগ্রহ করতে পারেন, তা টেলিমেডিসিনের কার্যকারিতা হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ, রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপের মতো সাধারণ পরীক্ষাগুলোও যদি সঠিকভাবে না করা যায়, তবে দূর থেকে সঠিক রোগ নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু, টেলিমেডিসিন সেবার মান নিয়ন্ত্রণ এবং ডেটা সুরক্ষাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা নিয়ে আরও নীতি প্রণয়ন ও তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।

স্মার্টফোনের উপর এই নির্ভরতা একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো কাজ করে। একদিকে এটি অভাবনীয় সুবিধা এনে দিলেও, অন্যদিকে এটি ডিজিটাল বৈষম্যকেও প্রকট করে তোলে। যাদের স্মার্টফোন নেই বা যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না, তারা এই সেবার বাইরে থেকে যান। World Bank-এর 'বাংলাদেশ ডিজিটাল হেলথ ল্যান্ডস্কেপ রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ এলাকার প্রায় ২০% পরিবার এখনও কোনো ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে না। এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে টেলিমেডিসিনের আওতায় আনতে হলে কেবল স্মার্টফোন-কেন্দ্রিক মডেল থেকে বেরিয়ে এসে কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক টেলিমেডিসিন কিয়স্কের মতো বিকল্প মডেলগুলোকেও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় ভাষার উপযোগী কন্টেন্ট তৈরি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সেবাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করা সম্ভব। টেলিমেডিসিন কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অংশ, যার সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ১২.০ ১২.৩ ১২.৬ ১৩.০
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (% মোট) ৮২% ৮৩% ৮৪% ৮৫%
গ্রামীণ এলাকায় স্মার্টফোন প্রবেশাধিকার (%) ৬২% ৬৮% ৭৩% ৭৮%
টেলিমেডিসিন পরামর্শের সংখ্যা (লক্ষ) ৪০ ৬০ ১০০ ১৫০

উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), World Bank 'বাংলাদেশ ডিজিটাল হেলথ ল্যান্ডস্কেপ রিপোর্ট ২০২৩', স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৪' অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে টেলিমেডিসিন কিয়স্ক স্থাপন এবং এ সংক্রান্ত সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ হেলথ ইনিশিয়েটিভ' প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য টেলিমেডিসিন সেবার ব্যবহার ও প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের উপর বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ব্যবস্থা করা।
  • World Bank-এর 'বাংলাদেশ ডিজিটাল হেলথ ল্যান্ডস্কেপ রিপোর্ট ২০২৩'-এর সুপারিশ অনুযায়ী, টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলির ডেটা সুরক্ষা এবং রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় টেলিমেডিসিন ডেটা সুরক্ষা নীতি' প্রণয়ন ও কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator