ডিজিটাল আসক্তি ও তরুণ মন: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো বিষণ্নতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল আসক্তি ও তরুণ মন: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো বিষণ্নতা

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
ডিজিটাল আসক্তি ও তরুণ মন: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো বিষণ্নতা
ডিজিটাল আসক্তি ও তরুণ মন: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো বিষণ্নতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য: দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯% ডিজিটাল ডিভ...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য: দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯% ডিজিটাল ডিভাইসের অত্যধিক ব্যবহারের কারণে 'সম্ভাব্য আসক্তি'র ঝুঁকিতে রয়েছে, যা তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত উপসর্গের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই গবেষণাটি, যা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (MOHFW) অধীনে পরিচালিত, স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে স্ক্রিনের ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে বাড়ছে এক নীরব মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের প্রবণতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তরুণদের সামাজিক মেলামেশা, শারীরিক কার্যকলাপ এবং এমনকি ঘুমের চক্রকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। NIMH-এর মহাপরিচালক উল্লেখ করেছেন যে, এই আসক্তি প্রায়শই একাকীত্ব, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে।

এই ডিজিটাল আসক্তি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) যৌথভাবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে যে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩০% প্রতিদিন গড়ে ৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করছে, যার মধ্যে প্রায় ৫০% বিনোদনমূলক কনটেন্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় হয়। এই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম তাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex)-এর কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক উপলব্ধির জন্য দায়ী। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, যারা দিনে ৭ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে 'ইন্টারনেট গেমিং ডিসঅর্ডার' (IGD) এবং 'সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন' (SMA)-এর লক্ষণগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। IEDCR-এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ইন্টারনেট গেমিং ডিসঅর্ডার সংক্রান্ত মানসিক স্বাস্থ্য সেবার চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা আগে খুব একটা দেখা যেত না। এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে তরুণদের উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ডিজিটাল আসক্তির এই ক্রমবর্ধমান ঢেউ মোকাবেলায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা আরও সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যদিও সরাসরি আসক্তি নিরাময়ে কোনো নির্দিষ্ট ঔষধ নেই, তবে আসক্তির ফলে সৃষ্ট বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা অনিদ্রার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে DGDA-এর তত্ত্বাবধান জরুরি। বিশেষত, আসক্তিজনিত কারণে তরুণদের মধ্যে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট বা স্লিপিং পিলের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি ও নির্দেশিকা প্রয়োজন। একইসাথে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র ২০২২-২০৩০' এ ডিজিটাল আসক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে এর বাস্তবায়নে আরও দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। উদাহরণস্বরূপ, এই কৌশলপত্রে 'মেন্টাল হেলথ লিটারেসি' বাড়ানোর কথা বলা হলেও, ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রচারণা বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম এখনো তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও ডেটা সংগ্রহের জন্য DGHS এবং IEDCR-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি, যাতে নীতি নির্ধারকরা বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী সমাধান বের করতে পারেন। তাছাড়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে তরুণদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণে প্রভাব ফেলছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

সংস্থা বছর পর্যবেক্ষণ/পরিসংখ্যান প্রভাব
NIMH ২০২৩ তরুণ জনগোষ্ঠীর ১৯% ডিজিটাল আসক্তির ঝুঁকিতে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত উপসর্গের বৃদ্ধি
DGHS ও IEDCR ২০২২-২০২৩ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৩০% প্রতিদিন ৬+ ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার ইন্টারনেট গেমিং ডিসঅর্ডার (IGD) ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন (SMA) বৃদ্ধি
IEDCR ২০১৮-২০২৩ IGD সংক্রান্ত মানসিক স্বাস্থ্য সেবার চাহিদা দ্বিগুণ জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত
MOHFW (জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র) ২০২২ ডিজিটাল আসক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত সচেতনতা ও বাস্তবায়নে ঘাটতি

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW)।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) যৌথভাবে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (National Action Plan) তৈরি করবে, যেখানে ডিজিটাল আসক্তিকে একটি স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রতিরোধ, নিরাময় এবং পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন ও বাজেট বরাদ্দ থাকবে। এই পরিকল্পনায় 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮' এর আওতায় ডিজিটাল আসক্তি সংক্রান্ত সেবাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
  • জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল আসক্তি স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করবে এবং আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য 'স্কুল সাইকোলজি সার্ভিস' প্রতিষ্ঠা করবে। এই সেবার আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন এবং অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজন করা হবে, যা 'জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০' এর স্বাস্থ্য উপ-নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে ডিজিটাল আসক্তিজনিত বিষণ্নতা বা উদ্বেগ নিরাময়ে ব্যবহৃত ঔষধের প্রেসক্রিপশন ও বিতরণ প্রক্রিয়া কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে অপব্যবহার রোধ করা যায়। একইসাথে, ডিজিটাল আসক্তি প্রতিরোধে কার্যকর থেরাপি ও সহায়ক প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে 'ঔষধ নীতি, ২০১৬' এর আলোকে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator