মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি: লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ ও বৈশ্বিক সরবরাহে নতুন ঝুঁকি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি: লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ ও বৈশ্বিক সরবরাহে নতুন ঝুঁকি

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি: লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ ও বৈশ্বিক সরবরাহে নতুন ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি: লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ ও বৈশ্বিক সরবরাহে নতুন ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত
গত ৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ইসরায়েলে অতর্কিত হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার ঢেউ এখন বৈশ্বিক ...

গত ৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ইসরায়েলে অতর্কিত হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার ঢেউ এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ও অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের জাহাজ লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ চেইনে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলির জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপরও গভীর ছায়া ফেলছে।

লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালী, যা সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরকে সংযুক্ত করে, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২% এবং বিশ্বব্যাপী সমুদ্রবাহিত তেলের প্রায় ১০% পরিবহন করে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এই প্রণালী দিয়ে দৈনিক প্রায় ৬.২ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এই পথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে, জাহাজগুলিকে আফ্রিকার দীর্ঘ পথ কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে বাধ্য হতে হয়, যা ভ্রমণের সময় প্রায় ১০-১৪ দিন বাড়িয়ে দেয় এবং জ্বালানি খরচ ও বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। এর ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫-১০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে সুয়েজ খালে এভার গিভেন কন্টেইনার জাহাজের আটকে পড়ার ঘটনা মাত্র ৬ দিনের জন্য বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করেছিল, যা লোহিত সাগরের বর্তমান দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির তুলনায় অনেক কম। এই ভূ-রাজনৈতিক সংকট শুধু তেল পরিবহনের খরচ বাড়ায়নি, বরং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এর বৈশ্বিক সরবরাহকেও প্রভাবিত করছে, কারণ কাতার থেকে ইউরোপগামী LNG ট্যাংকারগুলোও এই পথ ব্যবহার করে।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি এবং লোহিত সাগরের ঝুঁকি এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অপরিহার্য। ইরান সমর্থিত হুথিদের কার্যকলাপ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে, জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য নিজেদের সরবরাহ চেইনে বৈচিত্র্য আনা এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং বিকল্প সরবরাহ পথ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে কাজ করছে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন UN Peacekeeping মিশনগুলো এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে তাদের ভূমিকা আরও জোরদার করতে পারে, তবে তাদের ম্যান্ডেট ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই সংকট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতাগুলোকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যা দেশগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য আরও স্থিতিশীল ও বহুমুখী বাণিজ্যিক পথ অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ করছে।

সূচক ২০২২ সালের তথ্য ২০২৩ সালের প্রাক্কলন (সংকটের পূর্বে) ২০২৪ সালের প্রাক্কলন (সংকটের পরে)
লোহিত সাগর দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন (মিলিয়ন ব্যারেল) ৬.২ ৬.৪ ৫.০-৫.৫ (আফ্রিকা ঘুরে)
বৈশ্বিক সমুদ্রবাহিত তেলের শতকরা হার ১০% ১০.২% ৮.৫%
কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে অতিরিক্ত ভ্রমণের সময় (দিন) ০ ০ ১০-১৪
আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি (প্রতি ব্যারেল, আনুমানিক) ০ ০ $৫-$১০
বৈশ্বিক কন্টেইনার জাহাজের ট্র্যাফিকের পরিবর্তন (লোহিত সাগর) স্থিতিশীল স্থিতিশীল -৩০% থেকে -৫০%

উৎস: মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA), লয়েডস লিস্ট (Lloyd's List), আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা (IMO)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি 'জ্বালানি কূটনীতি কৌশলপত্র' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে বিকল্প উৎস ও সরবরাহ পথ চিহ্নিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সম্পাদনের বিষয়গুলি অগ্রাধিকার পাবে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা ফোরাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে লোহিত সাগরের ঝুঁকির মুখে সমন্বিত কৌশলগত জ্বালানি মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণের জন্য একটি 'BIMSTEC-সার্ক জ্বালানি নিরাপত্তা চুক্তি' স্বাক্ষর করা যেতে পারে।
  • জাতিসংঘের UN Peacekeeping মিশনগুলোর ম্যান্ডেট এবং সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানাতে হবে যাতে তারা লোহিত সাগর এবং এর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে নৌ নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে, প্রয়োজনে একটি 'বিশেষায়িত UN মেরিটাইম নিরাপত্তা টাস্কফোর্স' গঠন করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator