ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেম: দক্ষ জনবল তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেম: দক্ষ জনবল তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ

নুরুল ইসলাম  avatar   
নুরুল ইসলাম
ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেম: দক্ষ জনবল তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেম: দক্ষ জনবল তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে বছরে প্রায় ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই বিপুল সম্ভাবনাময় খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও, প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল দক্ষতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ বিকাশে একটি বড় অন্তরায়।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ নতুন কর্মপ্রার্থী যোগ হচ্ছে, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফ্রিল্যান্সিংকে আয়ের একটি টেকসই পথ হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সফট স্কিলস যেমন – ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন, টাইম ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) পরিচালিত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে কিছু প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো হলেও, সেগুলো প্রায়শই বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলোর উচ্চমানের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। যেমন, আধুনিক ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ব্যবহৃত সর্বশেষ ফ্রেমওয়ার্কস, ডেটা সায়েন্সের প্রয়োগিক দিক, বা উন্নত সাইবার নিরাপত্তা দক্ষতা শেখানোর ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করলেও, আন্তর্জাতিক মানের প্রোফাইল তৈরি বা জটিল প্রকল্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রিক দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

এই শূন্যতা পূরণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও, সেগুলোর সমন্বয় ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) বিভিন্ন বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং দক্ষতামূলক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করছে, কিন্তু এসব প্রশিক্ষণের মান নিয়ন্ত্রণ ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী মডিউল তৈরি করার ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, SEIP (Skills for Employment Investment Program) প্রকল্পের আওতায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, এদের মধ্যে কতজন সফলভাবে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করতে পেরেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদী আয় করছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং হালনাগাদ তথ্য প্রায়শই অপ্রাপ্য। তাছাড়া, বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS) এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার এখনো বেশ কম, যা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো প্রায়োগিক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে একটি বড় বাধা। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতা যেমন – ডিজিটাল সাক্ষরতা, ইংরেজিতে সাবলীলতা ও অনলাইন টুলস ব্যবহারের জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

খাত/উদ্যোগ ২০২০-২১ (আনুমানিক) ২০২২-২৩ (আনুমানিক) ২০২৪-২৫ (লক্ষ্যমাত্রা)
ফ্রিল্যান্সার সংখ্যা (লক্ষ) ৬.৫ ১০.০ ১৫.০
বার্ষিক রেমিট্যান্স (বিলিয়ন USD) ০.৮ ১.১ ১.৫
NSDA/SEIP প্রশিক্ষণার্থী (লক্ষ) ২.৮ ৩.৫ ৫.০
উচ্চশিক্ষায় কারিগরি/বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার (%) ১৫.০ ১৭.৫ ২৫.০

উৎস: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA), বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রক্ষেপণ।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে (DTE) ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে 'ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক স্ট্র্যাটেজিস' শীর্ষক বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক কোর্স চালু করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মতো প্রায়োগিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর অধীনে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে ফ্রিল্যান্সিং খাতের সুনির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে হবে। প্রশিক্ষণ মডিউলগুলোতে ব্লকচেইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত UI/UX ডিজাইনের মতো উচ্চ-চাহিদার দক্ষতাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সফল ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS) কে ফ্রিল্যান্সিং খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা ও সরবরাহের উপর নিয়মিত ও বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। এই সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি জাতীয় ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা উন্নয়ন নীতি (National Freelancing Skill Development Policy) প্রণয়ন করতে হবে, যা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ফ্রিল্যান্সিং উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতা অন্তর্ভুক্তির একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নুরুল ইসলাম

নুরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator