কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নতুন নেতৃত্ব | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নতুন নেতৃত্ব

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নতুন নেতৃত্ব
কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নতুন নেতৃত্ব
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ৫০টি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৭০% প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনো কো...

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ৫০টি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৭০% প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনো কোনো সুসংগঠিত নীতি বা প্রোগ্রাম চালু করতে পারেনি, যদিও কোভিড-১৯ মহামারী পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এর একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণা অনুযায়ী, দেশের কর্পোরেট কর্মজীবীদের মধ্যে ২৯% সরাসরি কর্ম-সংক্রান্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় ভুগছেন, যা তাদের কর্মদক্ষতা ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্ব কাঠামো প্রায়শই কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে উৎপাদনশীলতার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে এসেছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন নেতৃত্ব এবং এইচআর কৌশলগুলির প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে, কর্পোরেট নেতৃত্বকে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে, সাংগঠনিক সুস্থতা ও উৎপাদনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নেতৃত্বকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কর্মীরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন। এক্ষেত্রে, এইচআর বিভাগকে কেবল বেতন-ভাতা বা নিয়োগ সংক্রান্ত কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে, কর্মীদের মানসিক সুস্থতার জন্য প্রগতিশীল কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং সেশন, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ এবং কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নমনীয় কর্মঘণ্টা বা হাইব্রিড মডেল প্রবর্তন করা যেতে পারে। একই সাথে, নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কর্মীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে এবং তাদের অনুভূত চাপ কমাতে সাহায্য করে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ বা বুলিং প্রতিরোধেও কঠোর নীতি প্রণয়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা নতুন নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতেও এই নতুন চাহিদার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের প্রশিক্ষণ মডিউলে কর্পোরেট মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সহানুভূতিশীল নেতৃত্বের উপর বিশেষ কোর্স অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে ভবিষ্যতের কর্মীবাহিনী এবং নেতৃত্ব এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও সুসজ্জিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) অধীনস্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (HRM) এবং অর্গানাইজেশনাল ডেভেলপমেন্ট (OD) কারিকুলামে মানসিক স্বাস্থ্য ফার্স্ট এইড, সাইকোলজিক্যাল সেফটি এবং লিডারশিপ ট্রেইনিং অন এমপ্যাথি-এর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্দেশনা জারি করতে পারে। এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ কেবল কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেবে না, বরং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং কর্মপরিবেশকে উন্নত করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্পোরেট সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।

বছর কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির হার (শতাংশ) মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ জনিত অনুপস্থিতি হ্রাসের হার (শতাংশ)
২০১৯ ১২% ১৫ -
২০২০ ১৮% ২২ ৩%
২০২১ ২৮% ৩২ ৫%
২০২২ ৩৫% ৪৫ ৮%
২০২৩ ৪২% ৬০ ১০%

উৎস: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (BILS) এবং বিভিন্ন কর্পোরেট এইচআর বিভাগের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) তাদের বিদ্যমান দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির (যেমন SEIP) আওতায় 'কর্পোরেট মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা' এবং 'সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব' বিষয়ক বাধ্যতামূলক মডিউল অন্তর্ভুক্ত করবে, যা ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের সকল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ এবং সোশ্যাল সায়েন্স অনুষদের এইচআরএম (Human Resource Management) কারিকুলামে 'কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: নীতি ও প্রয়োগ' বিষয়ক একটি নতুন কোর্স প্রবর্তন করবে, যেখানে সাইকোলজিক্যাল সেফটি এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কৌশলকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
  • বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে 'কর্মজীবনের মানসিক চাপ মোকাবেলা' বিষয়ক সচেতনতামূলক সেমিনার আয়োজনের জন্য একটি বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরিতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator