আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ অর্থায়ন': জলবায়ু কূটনীতির আড়ালে নতুন শর্ত? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ অর্থায়ন': জলবায়ু কূটনীতির আড়ালে নতুন শর্ত?

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ অর্থায়ন': জলবায়ু কূটনীতির আড়ালে নতুন শর্ত?
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ অর্থায়ন': জলবায়ু কূটনীতির আড়ালে নতুন শর্ত?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের 'প্রথম জলবায়ু নীতি ঋণ' অনুমোদনের ঘোষণা এবং এর সাথে সংযুক্ত শর্তাবলী আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলো...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক বাংলাদেশের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের 'প্রথম জলবায়ু নীতি ঋণ' অনুমোদনের ঘোষণা এবং এর সাথে সংযুক্ত শর্তাবলী আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর 'সবুজ অর্থায়ন' কৌশলের গভীরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও এই তহবিলকে বাংলাদেশের জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে এই ঋণের শর্তাবলী কেবল পরিবেশগত মানদণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণেও সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের ধরন, জ্বালানি নীতিতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বাধ্যবাধকতা এবং এমনকি স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাবনা, যা সরাসরি জলবায়ু অর্থায়নের আওতায় পড়ে না, সেগুলো নিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে। এই ঘটনা জলবায়ু কূটনীতির আড়ালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নতুন ধরনের শর্তারোপের একটি উদাহরণ কিনা, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। তবে, এই অর্থায়নের প্রকৃতি এবং শর্তাবলী প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো সংস্থাগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ঋণ পোর্টফোলিওতে 'সবুজ প্রকল্প' বা 'জলবায়ু অর্থায়ন'কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ইতিবাচক প্রবণতা মনে হলেও, এর গভীরে প্রোথিত শর্তগুলো অনেক সময় গ্রহীতা দেশগুলোর সার্বভৌম অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংকের উল্লিখিত জলবায়ু নীতি ঋণের একটি শর্ত হলো, বাংলাদেশ সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। এই নীতিগত পরিবর্তন নিঃসন্দেহে পরিবেশের জন্য উপকারী, কিন্তু এর সাথে যুক্ত কারিগরি সহায়তা এবং প্রযুক্তির সরবরাহ প্রায়শই নির্দিষ্ট কিছু পশ্চিমা সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া, ঋণের একটি অংশে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং কৃষি পদ্ধতির আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিবর্তনের সুবিধাভোগী এবং ক্ষতিগ্রস্ত উভয় পক্ষই তৈরি হবে, এবং এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, এই ধরনের প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার চেয়ে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করে না।

শুধু অর্থনৈতিক দিক নয়, এই 'সবুজ অর্থায়ন' ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন কোনো দেশকে সবুজ অর্থায়ন সরবরাহ করে, তখন তারা সেই দেশের জলবায়ু নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং এমনকি আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। যেমন, BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। কিন্তু যখন কোনো সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার কাছ থেকে নির্দিষ্ট শর্তযুক্ত সবুজ অর্থায়ন গ্রহণ করে, তখন তা BIMSTEC-এর সম্মিলিত জলবায়ু কৌশল বা জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা থেকে ভিন্ন পথে চালিত হতে পারে। একই চিত্র দেখা যায় সার্ক (সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন) এর ক্ষেত্রেও, যেখানে সদস্য দেশগুলো প্রায়শই জলবায়ু অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভর করে। এই নির্ভরতা অনেক সময় আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অংশগ্রহণ বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতির পরিচায়ক, কিন্তু যখন জলবায়ু অর্থায়ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে শর্তারোপ করে, তখন তা পররাষ্ট্রনীতিতেও সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এই শর্তগুলো প্রায়শই এমন সংস্কারের প্রস্তাব করে যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বণ্টন এবং অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে, যা শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ঋণের শর্তে এমন কিছু থাকে যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে চালিত করে, তবে আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের দর কষাকষির ক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা মোট জলবায়ু অর্থায়ন (বিলিয়ন USD) (২০২০-২০২২) শর্তযুক্ত ঋণের অনুপাত (%) উল্লেখযোগ্য গ্রহীতা দেশ (২০২২)
বিশ্বব্যাংক (IBRD + IDA) ৬৭.৫ ৭২% ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ৪৫.০ (RSF) ৮৫% রুয়ান্ডা, বার্বাডোজ, বাংলাদেশ
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ২১.৮ ৬৯% পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (EIB) ৩০.২ ৭৮% মিশর, ইউক্রেন, মরক্কো

উৎস: বিশ্বব্যাংক, IMF, ADB, EIB বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২০-২০২২), জলবায়ু নীতি সংক্রান্ত নথি।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের শর্তাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের জন্য একটি বিশেষায়িত 'জলবায়ু অর্থায়ন কূটনীতি ইউনিট' গঠন করতে হবে, যা ঋণচুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় 'জাতীয় জলবায়ু কৌশল ২০৫০' এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শর্তাবলী নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনে অভিজ্ঞ পরামর্শকদের সহায়তা নেবে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি সম্মিলিত 'আঞ্চলিক জলবায়ু অর্থায়ন ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর একক শর্তারোপের ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং 'সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নরস ফোরাম'-এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে জলবায়ু অর্থায়নের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা ও দর কষাকষি করতে পারবে।
  • জাতিসংঘের 'UN Peacekeeping' মিশনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য 'জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা তহবিল' (CRF) গঠনের প্রস্তাবনা উত্থাপন করতে হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলোকে শর্তহীন অর্থায়ন সরবরাহ করবে এবং এর কার্যকারিতা 'জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ' কর্তৃক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator