সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ঘোষণা করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির অন্তত ৫০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব বা 'সবুজ' কারখানা থেকে আসবে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা কেবল বৈশ্বিক ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান পরিবেশ সচেতনতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারই নয়, বরং টেক্সটাইল খাতে একটি সবুজ বিপ্লবের পথে দেশের যাত্রাকে ত্বরান্বিত করার একটি সুস্পষ্ট সংকেত। বর্তমানে, বাংলাদেশে ১৮০টিরও বেশি লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (এলইইডি) সনদপ্রাপ্ত সবুজ কারখানা রয়েছে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি এবং এটি নিঃসন্দেহে দেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশের যোগান দেয়, দীর্ঘদিন ধরে 'ফাস্ট ফ্যাশন' মডেলের অংশ হিসেবে পরিবেশগত প্রভাবের জন্য সমালোচিত। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ভোক্তাদের চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে, স্থানীয় উৎপাদকরা পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো কারখানার জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং পানি ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো। উদাহরণস্বরূপ, অনেক কারখানায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌর প্যানেল স্থাপন এবং আধুনিক বর্জ্য জল পরিশোধন প্ল্যান্ট (ETP) ব্যবহার করা হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্য অনুযায়ী, সবুজ কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে, যা উচ্চ মূল্য সংযোজন এবং দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি করছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে, যেখানে গুণগত মান ও পরিবেশগত দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।
তবে, এই সবুজ বিপ্লবের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, সবুজ কারখানায় রূপান্তরের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ অত্যন্ত বেশি, যা ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তাদের (SMEs) জন্য একটি বড় বাধা। যদিও বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছে, তবুও পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা এবং প্রণোদনার অভাব পরিলক্ষিত হয়। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সবুজ প্রযুক্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, যা বর্তমানে সীমিত। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) পরিবেশগত নিয়মাবলী ও শ্রম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, সবুজ প্রযুক্তির প্রশিক্ষণে তাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। উপরন্তু, টেক্সটাইল খাতে কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া, কারণ বেশিরভাগ কাঁচামাল এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যেখানে পরিবেশগত মান নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন হতে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে, সবুজ পোশাকের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করা কঠিন হবে।
| সূচক | ২০১৬ | ২০২১ | ২০২৩ | ২০৩০ (লক্ষ্যমাত্রা) |
|---|---|---|---|---|
| মোট LEED সনদপ্রাপ্ত সবুজ কারখানা (সংখ্যা) | ৪৩ | ১৫০ | ১৮৭+ | ৩০০+ |
| রপ্তানি আয়ে সবুজ কারখানার অবদান (আনুমানিক %) | ৫% | ১৫% | ২০% | ৫০% |
| জ্বালানি সাশ্রয় (গড়, %) | ১৫% | ৩০% | ৪০% | ৫০% |
| পানি সাশ্রয় (গড়, %) | ১২% | ২৫% | ৩৫% | ৪৫% |
উৎস: BGMEA, BKMEA, EPB এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- সরকারকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সবুজ কারখানায় রূপান্তরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের ঋণ এবং বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) কর্তৃক সবুজ পণ্য রপ্তানির উপর প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে।
- কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এবং বিজিএমইএ/বিকেএমইএ-এর যৌথ উদ্যোগে সবুজ প্রযুক্তি পরিচালনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের উপর ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে। এতে শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং সবুজ কারখানার কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত হবে।
- টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানিতে পরিবেশবান্ধব উৎসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য নীতিগত নির্দেশনা জারি করতে হবে এবং স্থানীয়ভাবে পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে পরিবেশগত মানদণ্ড নির্ধারণ ও তদারকিতে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।