কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: কর্মসংস্থানমুখী পাঠ্যক্রম ও শিল্পের চাহিদার ফারাক ঘুচবে কবে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: কর্মসংস্থানমুখী পাঠ্যক্রম ও শিল্পের চাহিদার ফারাক ঘুচবে কবে?

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: কর্মসংস্থানমুখী পাঠ্যক্রম ও শিল্পের চাহিদার ফারাক ঘুচবে কবে?
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: কর্মসংস্থানমুখী পাঠ্যক্রম ও শিল্পের চাহিদার ফারাক ঘুচবে কবে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৪.২ শতাংশ বর্তমান...

সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৪.২ শতাংশ বর্তমানে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নিয়োজিত, যেখানে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০১১ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টতই নির্দেশ করে যে, কর্মসংস্থানমুখী পাঠ্যক্রম এবং শিল্প খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যেকার ব্যবধান ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন এই বিশাল ফারাক কেবল দক্ষ জনবলের অভাবই নয়, বরং বিপুল সংখ্যক তরুণকে বেকারত্বের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জগুলো কেবল শিক্ষার্থী সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণ, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, এবং শিল্প খাতের সাথে নিবিড় সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘদিনের অচলায়তন।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও, সেগুলোর মান এবং শিল্প খাতের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উদাহরণস্বরূপ, অটোমোবাইল, রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স, গার্মেন্টস ডিজাইন ও প্যাটার্ন মেকিং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেডগুলোতে যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয় বেকার থাকছে অথবা তাদের অর্জিত দক্ষতা শিল্পের বর্তমান চাহিদা মেটাতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ হলো, কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্পের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা পুরোনো প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ পায়, যা আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য অপ্রাসঙ্গিক। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) এ বিষয়ে সমন্বয়কের ভূমিকা পালনের চেষ্টা করলেও, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ বাকি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর অধীনে পরিচালিত কিছু কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের পাঠ্যক্রমকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়নের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, যেখানে ব্যবহারিক শিক্ষার চেয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

এই ব্যবধান ঘোচাতে হলে কেবল পাঠ্যক্রম সংস্কারই যথেষ্ট নয়, বরং প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ল্যাব ও সরঞ্জামের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও সেকেলে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কারিগরি শিক্ষা বিভাগ এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন গতি এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে, প্রশিক্ষকদের জন্য নিয়মিত শিল্প-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। একজন প্রশিক্ষক যদি শিল্পের সর্বশেষ প্রযুক্তি ও পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তবে তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের আধুনিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তুলবেন? এছাড়াও, ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসএমই) সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ স্থাপন অত্যন্ত দুর্বল। এসএমইগুলো প্রায়শই নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষ কর্মী পাওয়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, অথচ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সরবরাহ করতে পারে। এই সংযোগহীনতা উভয় পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনএসডিএ-এর উচিত, এই সংযোগ স্থাপনে কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা তৈরি করা, যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেবে এবং তাদের ফিডব্যাক পাঠ্যক্রম উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে।

সূচক ২০১৫ ২০১৮ ২০২২ লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০
মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ (%) ৯.৮% ১২.৫% ১৪.২% ৫০%
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণদের কর্মসংস্থান (%)* ৪২% ৪৮% ৫৪% ৭০%
শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ (%) ১৫% ২০% ২৫% ৮০%

উৎস: BANBEIS, NSDA, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)। *এই ডেটা অনুমানভিত্তিক এবং শিল্প জরিপ থেকে প্রাপ্ত গড় হিসাব।

সুপারিশ

  • ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) কে আরও শক্তিশালী করে ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট পলিসি-২০১১ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'এনএসডিএ অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৩-২০৩০' প্রণয়ন ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যেখানে প্রতিটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম প্রতি দুই বছর অন্তর সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের (যেমন - বিজিএমইএ, বিটিএমইএ, বিএএসআইএস) সরাসরি অংশগ্রহণে আধুনিকায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে এবং ইউজিসি এর অধীনে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় প্রশিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে, যার মাধ্যমে প্রতি তিন বছর অন্তর সকল কারিগরি প্রশিক্ষককে আধুনিক শিল্প প্রযুক্তি ও পদ্ধতির উপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এই প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ না হলে তাদের পদোন্নতি বা ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে এবং প্রশিক্ষণের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করতে হবে।
  • সরকারকে 'কারিগরি শিক্ষা আইন-২০১৮' এর আওতায় একটি 'শিল্প-শিক্ষা সংযোগ বোর্ড' (Industry-Academia Linkage Board) গঠন করতে হবে, যার প্রধান কাজ হবে দেশের প্রতিটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমপক্ষে পাঁচটি স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের (ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ) মধ্যে নিয়মিত ইন্টার্নশিপ, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তি (MoU) নিশ্চিত করা এবং এই বোর্ডকে BANBEIS-এর মাধ্যমে বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator