শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: স্মার্টফোন কি শেখার সঙ্গী নাকি নীরব ঘাতক? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: স্মার্টফোন কি শেখার সঙ্গী নাকি নীরব ঘাতক?

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: স্মার্টফোন কি শেখার সঙ্গী নাকি নীরব ঘাতক?
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: স্মার্টফোন কি শেখার সঙ্গী নাকি নীরব ঘাতক?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশের প্রায় ৪২% শিক্ষার্থী স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে নিদ্রাহীনতা,...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশের প্রায় ৪২% শিক্ষার্থী স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে নিদ্রাহীনতা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতাজনিত সমস্যায় ভুগছে, যা তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই গবেষণা, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক অনুমোদিত একটি প্রজেক্টের অংশ ছিল, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ডিজিটাল ডিভাইসের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। একসময় শিক্ষানুরাগীদের জন্য তথ্যের মহাসমুদ্র হিসেবে বিবেচিত স্মার্টফোন, এখন অনেকের কাছেই মানসিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) উভয়ের জন্যই এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা ও এর অপব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রবণতা কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি তাদের সামাজিকীকরণ, পড়াশোনার পদ্ধতি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (IEDCR) এর এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অনলাইন ক্লাসের প্রসারের ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিক্ষার্থীদের মধ্যে চোখের সমস্যা, ঘাড়ে ব্যথা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি সাইবারবুলিং এবং অনলাইন আসক্তির মতো মানসিক সমস্যাও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে কম বয়সী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের যাচাই-বাছাই না করে গ্রহণ করার প্রবণতা এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

ডিজিটাল ডিভাইসগুলির ক্রমাগত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশ ক্ষমতা হ্রাস করছে। মাল্টিটাস্কিংয়ের নামে একাধিক অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিভক্ত করে দেয়, যা গভীর পড়াশোনা এবং বিশ্লেষণমূলক চিন্তাভাবনার জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এর এক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা ঘুমের চক্রকে প্রভাবিত করে। এর ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিদ্রা এবং দিনের বেলায় ক্লান্তির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি তাদের শিক্ষাগত পারফরম্যান্স এবং মানসিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে এই সমস্যা মোকাবিলায় সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং ডিজিটাল লিটারেসি কর্মসূচির অভাব রয়েছে, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যেও স্মার্টফোনের সঠিক ব্যবহার এবং এর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব দেখা যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বছর স্মার্টফোন ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীর শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীর শতাংশ স্মার্টফোন-সম্পর্কিত অনিদ্রার হার (%) ডিজিটাল আসক্তির প্রবণতা (%)
২০২০ ৬২% ২৫% ১৮% ১৫%
২০২১ ৭০% ৩২% ২২% ২০%
২০২২ ৭৮% ৩৮% ২৬% ২৫%
২০২৩ ৮৫% ৪২% ৩০% ৩০%

উৎস: NIMH ও IEDCR এর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন, DGHS অনুমোদিত।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জাতীয় শিক্ষার্থী ডিজিটাল সুস্থতা নীতিমালা' প্রণয়ন করবে, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে স্মার্টফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা, অনলাইন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মের মান এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের রূপরেখা থাকবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে NIMH এর সহযোগিতায় 'শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র' স্থাপন করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করা হবে।
  • বাংলাদেশ ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এর তত্ত্বাবধানে স্মার্টফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের জন্য 'ডিজিটাল ওয়েলনেস লেবেলিং' প্রবর্তন বাধ্যতামূলক করা হবে, যেখানে ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের সম্ভাব্য মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে সুস্পষ্ট সতর্কতা থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator